TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

স্বাস্থ্যসেবা বনাম অভিবাসনঃ যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এনএইচএসকে ঘিরে অভিবাসন বিতর্ক আবারও তীব্র হয়েছে। রিফর্ম ইউকের নতুন এমপি সুয়েলা ব্রাভারম্যান এবং দলটির চেয়ারম্যান জিয়া ইউসুফ দাবি করেছেন, উচ্চ মাত্রার অভিবাসন জিপি সেবার ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করছে, ফলে ব্রিটিশ রোগীরা সময়মতো অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাচ্ছেন না। তাদের এ বক্তব্য আসে সেন্টার ফর মাইগ্রেশন কন্ট্রোলের প্রকাশিত তথ্যে গত বছর ৭৫২ হাজার ‘ফ্ল্যাগ-৪’ জিপি নিবন্ধনের উল্লেখের পর।

তবে সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘ফ্ল্যাগ-৪’ ক্যাটাগরিতে এমন ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয় যাদের পূর্ববর্তী ঠিকানা তিন মাস বা তার বেশি সময় যুক্তরাজ্যের বাইরে ছিল—যার মধ্যে নতুন অভিবাসীর পাশাপাশি ফিরে আসা ব্রিটিশ নাগরিকরাও থাকতে পারেন। গত বছরে মোট প্রায় ৬.৫ মিলিয়ন নতুন জিপি নিবন্ধনের মধ্যে এই সংখ্যা ছিল সামান্য বেশি এক-দশমাংশ। ফলে অভিবাসনকে একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার যুক্তি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এনএইচএসের কর্মী কাঠামো নিজেই অভিবাসননির্ভর।

বর্তমানে যুক্তরাজ্যে লাইসেন্সপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের ৪০ শতাংশের বেশি বিদেশে প্রশিক্ষিত, এবং নতুন নিবন্ধিত চিকিৎসকদের বেশিরভাগই আন্তর্জাতিক স্নাতক। অর্থাৎ যে ব্যবস্থাকে অভিবাসীরা নাকি চাপে ফেলছে, বাস্তবে সেটি তাদের অবদানেই পরিচালিত হচ্ছে।

স্বাস্থ্যসেবাকে ঘিরে অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য নতুন নয়। কট্টর ডানপন্থী মহলে দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করা হচ্ছে যে এনএইচএস “বিদেশিদের দ্বারা প্লাবিত”।

অথচ ইতিহাস বলছে, ১৯৪৮ সালে এনএইচএস প্রতিষ্ঠার পর বহু ব্রিটিশ চিকিৎসক বিদেশে পাড়ি জমানোর ফলে যুক্তরাজ্যকে সাবেক উপনিবেশগুলো থেকে চিকিৎসক নিয়োগে নির্ভর করতে হয়। ১৯৭১ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডে এনএইচএস চিকিৎসকদের প্রায় ৩১ শতাংশ বিদেশে জন্ম ও প্রশিক্ষিত ছিলেন। ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের চিকিৎসক ও নার্সরা যুদ্ধোত্তর ব্রিটেনে স্বাস্থ্যখাত টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

নীতিগত দ্বৈততাও স্পষ্ট। একদিকে অভিবাসন কমানোর রাজনৈতিক অঙ্গীকার, অন্যদিকে স্বাস্থ্যখাতে বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা। ২০১৫ সালে চালু হওয়া ইমিগ্রেশন হেলথ সারচার্জের আওতায় বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীদের বছরে ১,০৩৫ পাউন্ড অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হয়, যদিও তারা কর ও ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সও দেন। ফলে এনএইচএস ব্যবহারের জন্য অভিবাসীরা আর্থিকভাবেও অবদান রাখছেন।

গবেষণায়ও ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লাভাটনিক স্কুল অব গভর্নমেন্টের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে অভিবাসীর সংখ্যা বেশি, সেখানে এনএইচএসের অপেক্ষার সময় দীর্ঘ হয় না; বরং কিছু ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় সামান্য কম। বিশ্লেষকরা বলছেন, অভিবাসীরা তুলনামূলকভাবে তরুণ ও সুস্থ হওয়ায় তাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবহারের হার গড় ব্রিটিশ জনগোষ্ঠীর তুলনায় কম।

তবুও রাজনৈতিক অঙ্গনে এনএইচএস ও অভিবাসন—এই দুই আবেগঘন ইস্যুকে একত্র করে জনমত প্রভাবিত করার প্রবণতা বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রশিক্ষণ পদে ব্রিটিশ চিকিৎসকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব এবং সামাজিক সেবাকর্মী ভিসা কঠোর করার পরিকল্পনা সেই পরিবর্তিত নীতিগত অবস্থানের ইঙ্গিত বহন করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এনএইচএসের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের পেছনে কাঠামোগত জটিলতা, অর্থায়ন ও জনবল পরিকল্পনার ঘাটতি বড় কারণ হলেও, অভিবাসনকে দায়ী করা রাজনৈতিকভাবে সহজ সমাধান হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো—যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার একটি বড় অংশই অভিবাসী চিকিৎসক, নার্স ও কেয়ার কর্মীদের অবদানে টিকে আছে।

সূত্রঃ আল জাজিরা

এম.কে

আরো পড়ুন

খালি করা হলো বার্মিংহাম বিমানবন্দর, সমস্ত ফ্লাইট স্থগিত

গত নভেম্বরে যুক্তরাজ্যে ধর্মঘটের কারণে নষ্ট হয়েছে সাড়ে চার লাখ কর্মদিবস

বিতর্কিত রুয়ান্ডা প্ল্যানের পক্ষে ভোট ব্রিটিশ এমপিদের

নিউজ ডেস্ক