17.5 C
London
September 10, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

১৫ বছর অপেক্ষার অভিবাসন নীতি বদলের দাবিঃ বার্নহ্যামকে সতর্ক করলেন টিইউসি মহাসচিব

যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে অভিবাসীদের অপেক্ষার সময় বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেসের মহাসচিব পল নওয়াক। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদের অভিবাসন সংস্কার পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, বর্তমান প্রস্তাব সামাজিক সেবা খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে এবং উগ্র ডানপন্থী মনোভাব বাড়াতে পারে।

আগামী সপ্তাহে ব্রাইটনে ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নওয়াক সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে বক্তব্য দেন। অভিবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয়সহ কয়েকটি বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপ কামনা করেন।

জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বার্নহ্যাম শাবানা মাহমুদকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে বহাল রাখেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, কম বেতন পাওয়া ৩ লাখের বেশি কর্মীকে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে থাকার আইনগত অধিকার পেতে ১৫ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।

এই প্রস্তাবের আওতায় এমন অনেক কেয়ার ওয়ার্কার পড়তে পারেন, যারা কোভিড মহামারির পর যুক্তরাজ্যের কর্মী সংকট পূরণ করতে দেশটিতে এসেছিলেন। তাদের যুক্তরাজ্যে আসার সময় জানানো হয়েছিল, পাঁচ বছর পর তারা অনির্দিষ্টকালের বসবাসের অনুমতির জন্য আবেদন করতে পারবেন।

পল নওয়াক বলেন, মানুষ যখন একটি নির্দিষ্ট প্রত্যাশা নিয়ে যুক্তরাজ্যে এসেছিল, তখন নিয়ম পরিবর্তন করা ‘মৌলিকভাবেই অন্যায্য’। তিনি সরকারকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।

সামাজিক সেবা খাতের কর্মী সংকটের দিকটিও তুলে ধরেন টিইউসি মহাসচিব। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাজ্যের সামাজিক সেবা খাতে ১ লাখ ১১ হাজার কর্মীর পদ শূন্য রয়েছে।

নওয়াক বলেন, যত বেশি সম্ভব ব্রিটিশ নাগরিককে এসব কাজের জন্য প্রশিক্ষিত করা উচিত। তবে তার বক্তব্য অনুযায়ী, অর্থনীতি বিকশিত হওয়ার পাশাপাশি জনসংখ্যা বয়স্ক হয়ে ওঠার কারণে সামাজিক সেবার মতো খাতে বিদেশ থেকে কর্মী আসার প্রয়োজনীয়তা অব্যাহত থাকতে পারে।

নতুন অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা অর্জনের জন্য ১০ বা ১৫ বছর অপেক্ষার প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন নওয়াক। তার বক্তব্য, এত দীর্ঘ সময় স্থায়ী মর্যাদা ছাড়া বসবাস করলে মানুষের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

নিজের পারিবারিক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে নওয়াক জানান, তার দুই দাদা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন। একজন হংকং এবং অন্যজন পোল্যান্ড থেকে এসেছিলেন। তারা দুজনই যুক্তরাজ্যে পরিবার গড়ে তুলেছিলেন।

নওয়াক প্রশ্ন করেন, কেউ যদি ১০ বা ১৫ বছর যুক্তরাজ্যে বসবাস করেও দেশটিতে স্থায়ীভাবে থাকার আইনগত অধিকার না পান, তাহলে বাড়ি কেনা, চাকরি, সন্তানদের স্কুলে পাঠানোসহ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করবেন।

তার মতে, এ ধরনের দীর্ঘ অপেক্ষার ব্যবস্থা অভিবাসীদের ব্রিটিশ সমাজে একীভূত হওয়ার প্রচেষ্টার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হতে পারে।

অন্যদিকে, অভিবাসন নীতিতে কঠোর পরিবর্তনের পক্ষে থাকা লেবার রাজনীতিকদের যুক্তি হলো, এর মাধ্যমে অভিবাসন নিয়ে জনগণের উদ্বেগ কমানো এবং নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকের মতো জনপ্রিয়তাবাদী দলের আকর্ষণ কমানো সম্ভব হতে পারে।

তবে নওয়াকের বক্তব্য, স্থায়ীভাবে বসবাসের মর্যাদা পাওয়ার আগে অপেক্ষার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হলে এর বিপরীত ফলও হতে পারে এবং উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির প্রতি সমর্থন বাড়তে পারে।

তিনি বিশেষভাবে রিফর্ম ইউকের বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি বাসিন্দাদের স্থায়ী মর্যাদা পাওয়ার সুযোগ সীমিত করা হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে যুক্তরাজ্যে জন্ম না নেওয়া কিন্তু দীর্ঘদিন দেশটিতে বসবাস ও কাজ করা ব্যক্তিদের ব্রিটিশ সমাজে তাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে।

সম্প্রতি রিফর্ম ইউকের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র জিয়া ইউসুফের বিরুদ্ধে লেবার পার্টি ‘সরাসরি বর্ণবাদ’-এর অভিযোগ তুলেছিল। হলবর্ন অ্যান্ড সেন্ট প্যানক্রাস আসনের উপনির্বাচনে কিয়ার স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য রিফর্ম ইউকের সম্ভাব্য প্রার্থী সাবেক শিশু শরণার্থী সাগাল আবদি-ওয়ালিকে ব্রিটিশ নন বলে মন্তব্য করার পর তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ ওঠে।

নওয়াক স্বীকার করেন, সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে টিইউসির অনেক সদস্য রিফর্ম ইউকেকে ভোট দিয়ে থাকতে পারেন। তবে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন থেকে পাওয়া প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে তিনি দাবি করেন, নাইজেল ফারাজকে মানুষ যত বেশি দেখছে, তার প্রতি আগ্রহ তত কমছে।

ডোভার ও পোর্টসমাউথে অভিবাসীদের আগমন ঠেকাতে গত সপ্তাহে উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীর বিক্ষোভের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন নওয়াক। তিনি নাইজেল ফারাজ ও তার সহযোগীদের বক্তব্যের সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে ‘সরাসরি যোগসূত্র’ রয়েছে বলে দাবি করেন এবং বিক্ষোভকারীদের কর্মকাণ্ডকে ‘প্রাথমিক পর্যায়ের ফ্যাসিবাদ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

রিফর্ম ইউকের জনপ্রিয়তাবাদী আবেদন মোকাবিলায় জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন নওয়াক। বিশেষ করে বাড়তে থাকা জ্বালানি বিল মোকাবিলায় কম আয়ের পরিবারগুলোকে সহায়তার জন্য তিনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।

২৮ অক্টোবরের বাজেট সামনে রেখে নওয়াক কম আয়ের মানুষের জন্য জ্বালানি বিল কমাতে একটি ‘সামাজিক শুল্ক’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। তার মতে, ব্যাংকগুলোর ওপর অতিরিক্ত মুনাফা কর আরোপ করে এই অর্থের সংস্থান করা যেতে পারে।

২০০৮ সালের আর্থিক সংকটে জনগণের অর্থে ব্যাংকগুলোকে সহায়তা করার বিষয়টি উল্লেখ করে নওয়াক বলেন, যারা চলতি বছর ঘর গরম করার খরচ নিয়ে উদ্বিগ্ন, তাদের জন্য ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ন্যায্য অংশ দাবি করা অযৌক্তিক নয়।

এদিকে, হোম অফিস জানিয়েছে, গত বছরের নভেম্বরে অধিকাংশ অভিবাসীর জন্য স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা অর্জনের স্বাভাবিক সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার সংস্কার প্রস্তাব প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা ব্যক্তিদের জন্য অপেক্ষার সময় কম রাখার পথও প্রস্তাবে রাখা হয়েছে।

হোম অফিস জানিয়েছে, এসব সংস্কারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সরকারের পরামর্শ প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া যথাসময়ে প্রকাশ করা হবে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে পরিবার আনার পথ আরও কঠিনঃ আর্টিকেল এইটের ব্যাখ্যায় কঠোর আদালত

রাশিয়ার হুমকিতে পিছু হটল যুক্তরাজ্য

অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে যুক্তরাজ্যের বাড়িভাড়া