TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

২০ বছর পরও ব্রিটেনকে নাড়া দেয় বানাজ মাহমুদের হত্যাকাণ্ডঃ পরিবারই যখন হত্যার নির্দেশদাতা

এই মাসে যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ‘অনার কিলিং’ মামলাগুলোর একটি—বানাজ মাহমুদের হত্যাকাণ্ডের ২০ বছর পূর্তি হচ্ছে। ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে সংঘটিত এই ঘটনা ব্রিটেনজুড়ে নারীর অধিকার, পারিবারিক সহিংসতা ও অনার-ভিত্তিক নির্যাতন নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।

 

দক্ষিণ লন্ডনের মিচামে বসবাসকারী বানাজ মাহমুদের বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। ১০ বছর বয়সে তিনি পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে আসেন, যখন তার বাবা ইরাক থেকে পালিয়ে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে ব্রিটেনে প্রবেশ করেন। শৈশব থেকেই বানাজ ও তার চার বোন পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন, যা যুক্তরাজ্যে বসবাসের পরও থামেনি।

১৭ বছর বয়সে পারিবারিক সিদ্ধান্তে বানাজকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়েতে বাধ্য করা হয়। সেখানে তিনি নির্যাতনের শিকার হন এবং শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসেন। পরে তিনি নিজের পছন্দে এক যুবকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন, যা পরিবার মেনে নেয়নি।

নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগে বানাজ একাধিকবার পুলিশের কাছে সহায়তা চান। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে তার পরিবার তাকে হত্যার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু সেই অভিযোগগুলো যথাযথ গুরুত্ব পায়নি—যা পরবর্তীতে তদন্তে বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হয়।

পরিবারের তথাকথিত ‘সম্মান’ রক্ষার অজুহাতে বানাজকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তদন্তে উঠে আসে, এই পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিলেন তার বাবা মাহমুদ বাবাকির মাহমুদ এবং চাচা আরি আগা মাহমুদ। ২০০৬ সালের ২৪ জানুয়ারি এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় এবং পরে মরদেহ গোপনে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

বানাজ নিখোঁজ হওয়ার পর তার সঙ্গী রহমান সুলেমানি বিষয়টি পুলিশকে জানান। দীর্ঘ তদন্তের পর মরদেহ উদ্ধার হয় এবং একে একে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিটেকটিভ চিফ ইনস্পেক্টর ক্যারোলিন গুড বলেন, এটি একটি বিরল মামলা ছিল, যেখানে পরিবার ন্যায়বিচার চায়নি—কারণ তারাই হত্যার নির্দেশদাতা ছিল।

২০০৭ সালে আদালত বানাজের বাবাকে হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন, ন্যূনতম সাজা নির্ধারণ করা হয় ২০ বছর। চাচাকে দেওয়া হয় ন্যূনতম ২৩ বছরের যাবজ্জীবন। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত অন্য অভিযুক্তদেরও বিভিন্ন মেয়াদে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে আইটিভিতে ‘অনর’ নামে একটি নাট্যধর্মী সিরিজ নির্মিত হয়, যা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এতে তদন্ত কর্মকর্তা ও ভুক্তভোগীর কাহিনি তুলে ধরা হয়, যা নতুন প্রজন্মের কাছে ঘটনাটি পরিচিত করে তোলে।

বানাজের বোন বেখাল মাহমুদ বর্তমানে নিরাপত্তাজনিত কারণে নতুন পরিচয়ে জীবনযাপন করছেন। তিনি সম্প্রতি জানান, এই ঘটনা তাদের পরিবারে চিরস্থায়ী ভয় ও মানসিক ক্ষত তৈরি করেছে। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাজ্যে প্রস্তাবিত ‘বানাজ’স ল’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

প্রস্তাবিত এই আইনের লক্ষ্য হলো অনার-কিলিং ভিত্তিক নির্যাতনকে শাস্তির ক্ষেত্রে আলাদা ও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা। এতে একদিকে যেমন অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে তেমনি আগাম সতর্কতা ও ভুক্তভোগীদের সহায়তা জোরদার করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্রঃ দ্য মিরর

এম.কে

আরো পড়ুন

বিলেতে বাড়ি কেনাবেচা: শরিয়াহ কমপ্লায়েন্স মর্গেজ

পাকিস্তানের সাথে যুগান্তকারী বন্দিবিনিময় চুক্তি সাক্ষর করলেন প্রীতি প্যাটেল

যুক্তরাজ্যকে টিকা কর্মসূচি স্থগিতের আহ্বান ডব্লিউএইচও’র

নিউজ ডেস্ক