13.1 C
London
August 22, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

‘৫৮ লাখ শিক্ষার্থীকে বিভ্রান্ত করে স্টুডেন্ট লোন’, ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ

যুক্তরাজ্যের সরকার ৫৮ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীর কাছে স্টুডেন্ট লোন বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করেছে এবং ঋণের প্রকৃত ঝুঁকি গোপন করেছে বলে বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ট্রেজারি সিলেক্ট কমিটির এক যুগান্তকারী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্টুডেন্ট লোন কোম্পানি এমনভাবে ঋণ ব্যবস্থার প্রচার করেছে, যা একাধিক ক্ষেত্রে সরাসরি ‘মিস-সেলিং’ বা বিভ্রান্তিকর বিক্রির শামিল।

মঙ্গলবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ৫৮ লাখ শিক্ষার্থী ‘প্ল্যান-২’ স্টুডেন্ট লোন গ্রহণ করেন। ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত এসব ঋণের মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে ২১৩ বিলিয়ন পাউন্ডে, যা ব্রিটেনের ইতিহাসে অন্যতম বড় সরকারি ঋণ কর্মসূচি।

কমিটির মতে, সরকার শিক্ষার্থীদের বোঝাতে চেয়েছিল যে স্টুডেন্ট লোনের মাসিক পরিশোধ অনেকটা একটি মোবাইল ফোনের চুক্তি, ব্রডব্যান্ড বিল কিংবা সিনেমা দেখতে যাওয়ার খরচের মতো। অথচ বাস্তবে অনেক স্নাতককে প্রতি মাসে কয়েকশ পাউন্ড পর্যন্ত পরিশোধ করতে হচ্ছে। এমনকি অনেকে জানিয়েছেন, এই ঋণের কারণে তারা বাড়ি কেনার জন্য মর্টগেজও পাননি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো—ঋণ নেওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি যে ভবিষ্যতে সরকার চাইলে একতরফাভাবে ঋণের শর্ত পরিবর্তন করতে পারে। অথচ একটি বাণিজ্যিক ঋণচুক্তির ক্ষেত্রে এ ধরনের তথ্য গ্রাহককে স্পষ্টভাবে জানানো বাধ্যতামূলক।

২০১০ সালে ‘প্ল্যান-২’ চালুর সময় সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ২০১৬ সাল থেকে প্রতি বছর গড় আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণ পরিশোধ শুরু করার আয়ের সীমা বাড়ানো হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সরকার সেই সীমা স্থির (ফ্রিজ) করে রাখে। বর্তমানে এটি ২০৩০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে।

কমিটির প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, সরকার রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তরুণ প্রজন্মের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, “সরকার রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক পথ বেছে নিয়ে তরুণদের ওপর এই বোঝা চাপিয়েছে, এই আশা করে যে তারা হয়তো বিষয়টি বুঝতে পারবে না।”

ট্রেজারি সিলেক্ট কমিটির চেয়ার ডেম মেগ হিলিয়ার বলেন, বর্তমান স্টুডেন্ট লোন ব্যবস্থা নিয়ে আর নীরব থাকার সুযোগ নেই।

তার ভাষায়, “আমাদের ধৈর্যের সীমা শেষ হয়েছে। মন্ত্রীরা নিজেরাই স্বীকার করেন যে ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং অন্যায্য, কিন্তু এটি সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন না।”

তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, গত বছরের বাজেটে রিপেমেন্ট থ্রেশহোল্ড স্থির রাখার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে। তার মতে, এতে বছরে প্রায় ৩৫৫ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় হলেও জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এদিকে বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া শিক্ষা সচিব লরা ট্রট বলেন, বর্তমান স্টুডেন্ট লোন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। অনেক শিক্ষার্থী বিশাল ঋণের বোঝা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করছেন, অথচ তাদের চাকরির সম্ভাবনাও আশানুরূপ নয়।

তিনি অভিযোগ করেন, লেবার সরকার এই সমস্যার সমাধান না করে বরং রিপেমেন্ট থ্রেশহোল্ড স্থির রেখে পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।

বর্তমানে যাদের বার্ষিক আয় ২৯ হাজার ৩৮৫ পাউন্ডের বেশি, তাদের স্টুডেন্ট লোন পরিশোধ শুরু করতে হয়। ৩০ বছর পর অবশিষ্ট ঋণ মওকুফ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকাল থেকেই ঋণের ওপর সুদ যোগ হতে থাকে এবং দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত রিটেইল প্রাইস ইনডেক্স (RPI) অনুযায়ী সুদ গণনা করা হয়। তবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে সর্বোচ্চ সুদের হার ৬ শতাংশে সীমাবদ্ধ করা হবে।

কমিটি আরও সুপারিশ করেছে, ভবিষ্যতে সরকার যেন বেসরকারি ঋণদাতাদের মতো একই ভোক্তা-সুরক্ষা নীতির আওতায় আসে এবং ঋণ নেওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের স্পষ্টভাবে জানানো হয় যে ভবিষ্যতে ঋণের শর্ত পরিবর্তন করা হতে পারে।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার অর্থায়ন নতুনভাবে সাজিয়ে রাষ্ট্র ও শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫০:৫০ অনুপাতে ব্যয় ভাগাভাগির প্রস্তাবও দিয়েছে কমিটি।

ভোক্তা অধিকার বিশেষজ্ঞ মার্টিন লুইস সরকারের সাম্প্রতিক নীতিকে “নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য” বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো সরকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমন আচরণ করতে না পারে, সেজন্য স্টুডেন্ট লোন ব্যবস্থাকেও বেসরকারি ঋণদাতাদের মতো কঠোর ভোক্তা সুরক্ষা নীতির আওতায় আনতে হবে।

অন্যদিকে স্টুডেন্ট লোন কোম্পানি জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের কাছে পরিষ্কার, নির্ভুল ও সময়োপযোগী তথ্য পৌঁছে দেওয়াকে তারা অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং সংসদীয় প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করবে।

সরকারও এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, শিক্ষার্থী, স্নাতক ও করদাতাদের জন্য আর্থিকভাবে টেকসই উপায়ে স্টুডেন্ট লোন ব্যবস্থাকে আরও ন্যায্য করার বিষয়টি তারা বিবেচনা করছে এবং ট্রেজারি সিলেক্ট কমিটির প্রতিবেদনের আনুষ্ঠানিক জবাব যথাসময়ে দেওয়া হবে।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

হিথ্রোতে বাতিল হলো ১০০ মিলিলিটারের তরল সীমা, নিরাপত্তা তল্লাশিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন

হাসপাতালে ভর্তি ওয়েলসের রাজকুমারী কেট মিডলটন

যুক্তরাজ্যের হান্টারকম্ব হাসপাতালে কিশোরীর মৃত্যুঃ সিস্টেমের চরম ব্যর্থতার অভিযোগ