TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

রিফর্ম ইউকের ১০ নীতি ঘিরে শঙ্কাঃ স্বাস্থ্যসেবা থেকে অভিবাসন—ব্রিটিশদের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে রিফর্ম ইউকে এবং দলটির নেতা নাইজেল ফারাজ। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে তিনি যে নীতিমালা তুলে ধরেছেন, তা নিয়ে সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদ ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। গণহারে ব্যয়ছাঁটাই, অভিবাসন নীতি কঠোরকরণ এবং রাষ্ট্রীয় সেবা পুনর্গঠনের মতো প্রস্তাবগুলো ব্রিটিশ সমাজে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

রিফর্ম ইউকে রাষ্ট্রের আকার জিডিপির ৩৫ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এর অর্থ প্রায় ২৭৪ থেকে ৩০০ বিলিয়ন পাউন্ড সরকারি ব্যয় কমানো। তবে এই বিশাল অঙ্কের কাটছাঁট কোথায় হবে, সে বিষয়ে দলটি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনসহ অনেক বিশ্লেষকের আশঙ্কা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতই এর সবচেয়ে বড় শিকার হতে পারে।

দলটি জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এনএইচএস থেকে ২৬ বিলিয়ন পাউন্ড কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে যাদের সামর্থ্য আছে, তাদের বেসরকারি চিকিৎসায় যেতে করছাড় দিয়ে উৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এতে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য আরও বেড়ে যেতে পারে।

নাইজেল ফারাজ এনএইচএসকে সাধারণ কর-ভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে বীমাভিত্তিক মডেলে নেওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। যদিও কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা তিনি দেননি, তবু এই বক্তব্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার মূল কাঠামোই ভেঙে পড়তে পারে।

করনীতিতেও রিফর্ম ইউকের অবস্থান বিতর্কিত। ‘ব্রিটানিয়া কার্ড’ নামে একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে বিদেশি কোটিপতি ও বিলিয়নিয়ারদের এককালীন ফি দিয়ে কর ছাড় পাওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কর বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, এতে পাঁচ বছরে যুক্তরাজ্যের রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন পাউন্ড।

অভিবাসন নীতিতে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে রিফর্ম ইউকে। দলটি ‘ইন্ডেফিনিট লিভ টু রিমেইন’ সম্পূর্ণ বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে, যার ফলে শত শত হাজার বৈধ অভিবাসীর স্থায়ী বসবাসের অধিকার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। প্রধানমন্ত্রী এই নীতিকে বর্ণবাদী আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এটি সমাজে গভীর বিভাজন সৃষ্টি করবে।

পরিবেশ ও জ্বালানি নীতিতেও রিফর্ম ইউকের অবস্থান বর্তমান মূলধারার বিপরীত। দলটি নেট জিরো লক্ষ্য বাতিল এবং পরিষ্কার জ্বালানি প্রকল্পের বিরোধিতা করছে। এর ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে প্রায় ১০ লাখ চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ফ্র্যাকিং চালুর পরিকল্পনা পরিবেশগত ও ভূমিকম্প ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও উত্তেজনার আশঙ্কা রয়েছে। ইইউ নাগরিকদের ভাতা সীমিত করা এবং ব্রেক্সিট চুক্তির অংশ পুনর্বিবেচনার হুমকি বাণিজ্য যুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে যুক্তরাজ্যের রপ্তানি ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও রিফর্ম ইউকে অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে, যদিও এর বিকল্প কী হবে তা স্পষ্ট নয়। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে শিশু ও দুর্বল ব্যবহারকারীরা অনলাইনে আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।

শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কিত সদ্য পাস হওয়া এমপ্লয়মেন্ট রাইটস অ্যাক্ট পুরোপুরি বাতিল করার ঘোষণাও দিয়েছে দলটি। এই আইনের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া পিতৃত্বকালীন ছুটি, অসুস্থতাজনিত ছুটি ও জিরো আওয়ার চুক্তি বন্ধের মতো সুরক্ষা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সব মিলিয়ে, রিফর্ম ইউকে ও নাইজেল ফারাজের ঘোষিত নীতিগুলো একদিকে যেমন সমর্থকদের কাছে ‘পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি’, অন্যদিকে বহু ব্রিটিশ নাগরিকের কাছে তা হয়ে উঠেছে অর্থনীতি, সামাজিক সেবা ও অধিকার নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার কারণ।

সূত্রঃ দ্য মেট্রো

এম.কে

আরো পড়ুন

সিলেট – লন্ডন ফ্লাইটে মাতাল যাত্রী’র লঙ্কাকাণ্ড

ব্রিটেনে ৪২০ পাউন্ড সুবিধা পাবে ১০ লাখ পরিবার!

লন্ডন হাই কমিশনের অবহেলার শিকার ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা