যুক্তরাজ্যের লেবার সরকারের অভিবাসন নীতি নিয়ে এবার প্রকাশ্যে সংঘাতে জড়িয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ এবং তার অধীনস্থ অভিবাসনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মাইক ট্যাপ। সরকারি নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া, মন্ত্রিসভার আচরণবিধি ভঙ্গ এবং সংবেদনশীল সরকারি নথি ফাঁসের হুমকির অভিযোগ এনে প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের কাছে মাইক ট্যাপকে মন্ত্রিসভা থেকে বরখাস্ত করার আবেদন জানিয়েছেন শাবানা মাহমুদ।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বিরোধ আরও তীব্র হওয়ায় মাইক ট্যাপের সরকারি নথিপত্রে প্রবেশাধিকারও সীমিত করা হয়েছে। শাবানা মাহমুদের অনুমতি ছাড়া তিনি কোনো সরকারি নথি দেখতে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিতে পারবেন না।
বিতর্কের সূত্রপাত হয়, যখন মাইক ট্যাপ একটি জাতীয় দৈনিকে নিবন্ধ লিখে সরকারের প্রস্তাবিত অভিবাসন নীতির বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, কেয়ার কর্মী ভিসায় যুক্তরাজ্যে আসা বিদেশিদের ক্ষেত্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমতির জন্য অপেক্ষার সময় পাঁচ বছর থেকে ১০ বছরে বাড়ানো উচিত নয়। তার দাবি, এসব কর্মী যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সেবাখাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাই তাদের নতুন কঠোর নিয়মের বাইরে রাখা উচিত।
ট্যাপ আরও দাবি করেন, তিনি কয়েক মাস ধরে এই নীতিগত প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছেন এবং তার কাছে তার প্রমাণও রয়েছে।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, শাবানা মাহমুদের অনুমতি ছাড়াই তিনি এই নিবন্ধ লিখেছেন এবং মন্ত্রিসভার অভ্যন্তরীণ আলোচনার বিষয় প্রকাশ করেছেন, যা যৌথ দায়িত্ববোধের নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সরকারি সূত্রের দাবি, ট্যাপ এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তার কাছে নীতিগত আলোচনার নথিপত্র রয়েছে, যা প্রকাশ করা হতে পারে। এ কারণেই তার সরকারি নথিতে প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছে।
বরখাস্তের দাবি ওঠার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানান মাইক ট্যাপ। তিনি বলেন, তাকে ভয় দেখিয়ে নিজের অবস্থান থেকে সরানো যাবে না। তার ভাষায়, শুরুতে অভিযোগ ছিল তিনি আচরণবিধি ভঙ্গ করেছেন, এখন বলা হচ্ছে তিনি অন্যের ধারণা নিজের বলে দাবি করেছেন। তিনি সবাইকে তার নিবন্ধ পড়ার আহ্বান জানান এবং এ বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন।
যদিও প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার এখন পর্যন্ত কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, মন্ত্রীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উভয় মন্ত্রীর ওপর আস্থা রাখেন বলেও জানানো হয়েছে।
এই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সরকারের নতুন অভিবাসন পরিকল্পনা। প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেতে অভিবাসীদের অপেক্ষার সময় পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার পরিকল্পনা রয়েছে। সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো, এই পরিবর্তন আগে থেকেই যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও কার্যকর হতে পারে।
লেবার পার্টির ভেতরেও এই পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রায় একশ জন লেবার সংসদ সদস্য এর বিরোধিতা করেছেন। তাদের অভিযোগ, আগে আসা অভিবাসীদের ওপর নতুন নিয়ম প্রয়োগ করা অন্যায্য এবং ব্রিটিশ ন্যায়নীতির পরিপন্থী। উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনারও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশকারী সংসদ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন।
সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় থাকা অ্যান্ডি বার্নহ্যামও এর আগে বলেছেন, পূর্বের নিয়মে যুক্তরাজ্যে আসা ব্যক্তিদের ওপর নতুন নিয়ম চাপিয়ে দিলে তারা দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে এবং সমাজের সঙ্গে পুরোপুরি একীভূত হতে পারবে না। তবে তার দপ্তর জানিয়েছে, এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে শাবানা মাহমুদ সরকারের অবস্থানকে সমর্থন করে বলেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্যে আসা প্রায় ১৬ লাখ অভিবাসী যদি আগের নিয়ম অনুযায়ী দ্রুত স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পান, তাহলে সরকারি সেবা ও সামাজিক ভাতা খাতে বহু বিলিয়ন পাউন্ড অতিরিক্ত ব্যয় হবে। তাই জনস্বার্থেই এই পরিবর্তন প্রয়োজন।
সরকার ইতোমধ্যে প্রস্তাবিত নীতির ওপর জনমত গ্রহণ করেছে, যেখানে প্রায় দুই লাখ মতামত জমা পড়েছে। আলোচনায় রয়েছে, বিদেশি কেয়ার কর্মী, সরকারি সেবাখাতে কর্মরত বিদেশি পেশাজীবী এবং উচ্চ আয়ের কিছু কর্মীকে নতুন নিয়ম থেকে আংশিক বা সম্পূর্ণ ছাড় দেওয়া হতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে স্বাস্থ্য ও কেয়ার ভিসা কর্মসূচির আওতায় ৬ লাখ ১৬ হাজার ২৬৬টি ভিসা ইস্যু করা হয়েছে। ফলে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত লাখো অভিবাসী ও তাদের পরিবারের ভবিষ্যতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

