TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য কঠোর নতুন নীতিঃ সরকারি খরচ না দিলে মিলবে না স্থায়ী বসবাসের অনুমতি

যুক্তরাজ্যের লেবার সরকার আশ্রয় ও অভিবাসন ব্যবস্থা আরও কঠোর করার লক্ষ্যে নতুন একটি বিস্তৃত সংস্কার প্যাকেজ সংসদে উপস্থাপন করতে যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ঘোষিত নতুন পরিকল্পনায় সরকারি সহায়তায় বসবাসকারী আশ্রয়প্রার্থীদের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে তাদের কাছ থেকে সরকারি ব্যয়ের একটি অংশ আদায়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, যাদের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে, তাদের প্রায় ১০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত সরকারি আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় পরিশোধ করতে হবে। অন্যথায় তারা যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা সেটেলড স্ট্যাটাস পাবেন না।

সরকারের নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় বিল মঙ্গলবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে উপস্থাপিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিলটিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি “নৈতিক দায়িত্ব” হিসেবে বর্ণনা করলেও শরণার্থী অধিকার সংগঠনগুলো এর তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের দাবি, যুদ্ধ, নির্যাতন ও দুর্ভিক্ষ থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে আসা মানুষের ওপর এটি কার্যত অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার শামিল।

নতুন পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিরাপদ ও বৈধ উপায়ে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ বাড়ানো। সরকারের বিবেচনায় নিয়োগকর্তার স্পনসরশিপসহ বিভিন্ন বৈধ পথ দ্রুত চালুর বিষয়টি রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ ও বৈধ আশ্রয়পথের অভাবই বহু মানুষকে ইংলিশ চ্যানেল ছোট নৌকায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে পার হয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

শাবানা মাহমুদ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কঠোর অভিবাসন নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। তিনি এর আগে অবৈধ অভিবাসনকে দেশের সামাজিক সংহতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তার নেতৃত্বে সরকার ইতোমধ্যে একাধিক কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

সরকারের পূর্বঘোষিত পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়া পরিবার—এমনকি শিশু থাকা পরিবারগুলোকেও—দ্রুত ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা, মানবাধিকার আইনের নির্দিষ্ট ধারার ব্যবহার সীমিত করা, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়তা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা কমানো এবং আবেদনকারীদের বয়স যাচাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা। এছাড়া চলতি বছরের শুরুতে সরকার শরণার্থী মর্যাদাকেও স্থায়ী না রেখে প্রতি ৩০ মাস অন্তর পুনর্মূল্যায়নের ব্যবস্থা চালু করেছে।

তবে এসব পদক্ষেপ নিয়ে লেবার পার্টির ভেতরেও মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে অভিবাসী পরিচর্যা খাতের কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা অর্জনের সময়সীমা পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে সরকারের ভেতরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। শ্রমিক অধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন অভিযোগ করেছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যের সংকটাপন্ন পরিচর্যা খাত সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, তাদের ক্ষেত্রে মাঝপথে নিয়ম পরিবর্তন অন্যায় হবে।

এদিকে ব্রিটিশ ফিউচারের পরিচালক সুন্দর কাটওয়ালা মনে করেন, শুধু কঠোর আইন করলেই ছোট নৌকায় অবৈধভাবে চ্যানেল পারাপার পুরোপুরি বন্ধ হবে না। তার মতে, কার্যকর সমাধানের জন্য একই সঙ্গে বৈধ ও নিরাপদ আশ্রয়পথ সম্প্রসারণ এবং অবৈধ পথে প্রবেশকারীদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

ব্রিটিশ ফিউচারের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, গত বছরে যুক্তরাজ্যে নিট অভিবাসন উল্লেখযোগ্য ভাবে কমলেও প্রতি ছয়জনের মধ্যে মাত্র একজন এ তথ্য সম্পর্কে অবগত। একই সময়ে চলতি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো মানুষের সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর সীমান্ত নীতিও এই হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন ইস্যু এখন যুক্তরাজ্যের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে পরিণত হয়েছে। সরকার একদিকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতে চাইছে, অন্যদিকে মানবিক দায়বদ্ধতা ও বৈধ আশ্রয় ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

ইউরোপের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ ভয়াবহ যুক্তরাজ্যে

দুবাইয়ে যুবকের মৃত্যুঃ ব্রিটিশ চার যুবক অভিযুক্ত

ব্রিটিশদের ১০ দিন কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামূলক করল ভারত

অনলাইন ডেস্ক