ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে বিশ্ব জলবায়ু সংকট নিয়ে নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে এবং মানবসভ্যতা একই সঙ্গে জলবায়ু ও জ্বালানি—এই দুই বড় সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
লন্ডন ক্লাইমেট অ্যাকশন উইকে মঙ্গলবার দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে গুতেরেস বলেন, চার্লস ডিকেন্সের শহর লন্ডনে দাঁড়িয়ে এখন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে যে পৃথিবী ‘দুটি সংকটের গল্প’-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একটি হলো জলবায়ু সংকট, যা বিশ্বকে ক্রমাগত উচ্চ তাপমাত্রা ও বিপজ্জনক সীমার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যটি জ্বালানি সংকট, যা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিনির্ভরতার ভয়াবহ পরিণতি সামনে এনে দিয়েছে।
তিনি বলেন, “এই দুই সংকটকে আলাদা মনে হলেও তাদের উৎস একটিই—জীবাশ্ম জ্বালানি।” পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে তিনি মন্তব্য করেন, “লন্ডন এখন আগুনের চুলায় রান্না হচ্ছে।”
এদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তাপপ্রবাহ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্পেনের প্রায় পুরো দেশজুড়ে তাপপ্রবাহ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। দেশটির জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা এএমইটি দক্ষিণাঞ্চলের কর্ডোবা, উত্তরাঞ্চলের বিলবাও এবং কান্তাব্রিয়ার কয়েকটি এলাকায় সর্বোচ্চ স্তরের ‘রেড অ্যালার্ট’ ঘোষণা করেছে।
ফ্রান্স সীমান্তবর্তী বাস্ক অঞ্চলের কিছু এলাকায় ছায়ায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সাধারণত এ অঞ্চলে এমন তাপমাত্রা খুবই বিরল।
একই সময়ে ফ্রান্সে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ রাত রেকর্ড করা হয়েছে। দেশটির জাতীয় আবহাওয়া সংস্থার তথ্যমতে, ১৯৪৭ সালে তাপমাত্রা পরিমাপ শুরু হওয়ার পর সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত সময়ের গড় জাতীয় তাপমাত্রা ২১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। এর আগে সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল ২০১৯ সালের জুলাই মাসে ২১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
চলমান তাপপ্রবাহ শুধু আবহাওয়াতেই নয়, ইউরোপের জ্বালানি খাতেও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। অতিরিক্ত গরমের কারণে কোটি কোটি মানুষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহার করায় বিদ্যুতের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। অন্যদিকে ইউরোপজুড়ে বিরাজমান ‘হিট ডোম’ পরিস্থিতির কারণে বাতাসের গতি কমে যাওয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনও হ্রাস পেয়েছে।
পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে ফ্রান্সের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে একটি বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিঅ্যাক্টর সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়েছে। কেন্দ্রটি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইডিএফ জানিয়েছে, পর্যাপ্ত শীতলীকরণ পানি না পাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে এবং আগামী সপ্তাহে তাপমাত্রা স্বাভাবিক হলে পুনরায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি ও উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে ইউরোপজুড়ে বিদ্যুতের বাজারে মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। জার্মানিতে পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টায় ৫৪৫ ইউরোর বেশি পৌঁছেছে, যা গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ফ্রান্সেও বিদ্যুতের দাম ২৬৮ ইউরোর বেশি উঠেছে, আর যুক্তরাজ্যে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের মূল্য প্রায় ২৩০ পাউন্ডে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতি জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাবের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা শুধু মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিই বাড়াচ্ছে না, একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অর্থনীতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। জাতিসংঘের মহাসচিবের সতর্কবার্তা তাই বিশ্বনেতাদের জন্য নতুন করে একটি শক্ত বার্তা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

