সাইপ্রাসে ব্রিটেনের সামরিক ঘাঁটি ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও জনমত সংকট তৈরি হয়েছে। আরএএফ আক্রোটিরি বিমানঘাঁটিতে নজিরবিহীন ড্রোন হামলার পর দেশটিতে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে স্থানীয়দের প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক চাপ দ্রুত বাড়ছে।
রাজধানী নিকোসিয়ায় শনিবার শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। “মৃত্যুর ঘাঁটি বের করে দাও” স্লোগান দিতে দিতে তারা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের দিকে মিছিল করেন। বিক্ষোভকারীদের দাবি, ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনাগুলোর উপস্থিতির কারণে সাইপ্রাস এখন আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং দেশটি অপ্রয়োজনীয়ভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িয়ে যেতে পারে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া নাগরিক মাথাইওস স্তাভরিনিদেস বলেন, এসব সামরিক ঘাঁটি সাইপ্রাসের নিরাপত্তার জন্য হুমকি এবং এগুলো কখনোই এখানে থাকা উচিত ছিল না। তার মতে, স্বাধীনতার সময়কার চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন দ্বীপে যে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে, তা এখন দেশের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কনস্টানতিনোস কম্বোস জানিয়েছেন, আরএএফ আক্রোটিরি বিমানঘাঁটিতে আঘাত হানা ইরান নির্মিত ড্রোনটি লেবানন থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। তিনি বলেন, লেবাননে ইরানের মিত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের উপস্থিতি রয়েছে এবং সেই অঞ্চল থেকেই এই হামলা চালানো হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ড্রোন হামলার ঘটনার পর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দ্বীপের কাছাকাছি আরও দুটি যুদ্ধ ড্রোন শনাক্ত করে প্রতিরোধ করা হয়। কর্মকর্তারা জানান, এই ড্রোনগুলোর উৎসও লেবানন এবং সেগুলো দ্বীপ থেকে প্রায় ১৫০ মাইল পূর্ব দিক থেকে পাঠানো হয়েছিল।
কম্বোস বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে লেবাননমুখী ফ্রন্টকে বিশেষভাবে নজরদারির আওতায় আনতে হচ্ছে। তার মতে, উত্তর-পূর্ব দিক থেকেও সম্ভাব্য হুমকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, তাই সাইপ্রাসকে সব ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে হচ্ছে।
সাইপ্রাস সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানের পর থেকে সাইপ্রাস প্রজাতন্ত্রকে নয়, বরং দ্বীপে থাকা ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিগুলোকেই হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেখা হচ্ছে। তারা দাবি করেন, গত বছর থেকেই লন্ডনকে এই ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল।
আরএএফ আক্রোটিরি মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটেনের সামরিক অভিযানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরওয়ার্ড অপারেশন ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৬০ সালে সাইপ্রাস স্বাধীন হওয়ার সময় ব্রিটেন দ্বীপের প্রায় ৩ শতাংশ ভূমি নিজেদের সামরিক ব্যবহারের জন্য রেখে দেয়, যার মধ্যে এই ঘাঁটিটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ড্রোন হামলার পর সাইপ্রাসের অনুরোধে কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ দ্রুত যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক বিমান মোতায়েন করেছে। এই সামরিক সহায়তা দ্বীপে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর প্রতিরক্ষা জোরদার করতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্রিটেনও তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। রয়্যাল নেভির ওয়াইল্ডক্যাট হেলিকপ্টার এবং অতিরিক্ত এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, এই পদক্ষেপ অনেক দেরিতে নেওয়া হয়েছে।
ব্রিটিশ ডেস্ট্রয়ার এইচএমএস ড্রাগন বর্তমানে পোর্টসমাউথে মেরামত ও পুনর্গঠনের কাজ শেষ করছে এবং আগামী সপ্তাহের পরের দিকে সাইপ্রাস উপকূলে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এদিকে সাইপ্রাস সরকার বর্তমানে ১৯৭৪ সালের পর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলা করছে। ওই বছর গ্রিসের সঙ্গে একত্রীকরণের প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে তুরস্ক দ্বীপে সামরিক অভিযান চালায়, যার প্রভাব এখনো দেশটির রাজনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে রয়েছে।
দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোস ক্রিস্টোদুলিদেস জানিয়েছেন, সাইপ্রাস কোনো সামরিক অভিযানে জড়াতে চায় না। তবে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কোনো বিকল্পই উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভাসিলিস পালমাস জানান, হামলাকারী শাহেদ ধাঁচের ড্রোনটি প্রায় এক হাজার মিটার উচ্চতায় এবং ঘণ্টায় প্রায় ৯০ থেকে ১০০ মাইল গতিতে উড়ছিল। খুব নিচু উচ্চতা ও দ্রুতগতির কারণে সেটি সহজে রাডারে ধরা পড়েনি এবং তাই বিমানঘাঁটিতে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।
ড্রোন হামলার পর ঘটনার বিবরণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় স্থানীয়দের ক্ষোভ আরও বেড়েছে। প্রথমে বলা হয়েছিল ড্রোনটি রানওয়েতে আঘাত করেছে, পরে ধ্বংস হওয়া একটি হ্যাঙ্গারের ছবি প্রকাশিত হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউ–২ গোয়েন্দা বিমান রাখা ছিল বলে জানা যায়।
এই পরিস্থিতিতে সাইপ্রাসে ব্রিটিশ সামরিক উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে এবং অনেক নাগরিক এখন দ্বীপে থাকা এসব ঘাঁটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের সিদ্ধান্তের দাবি জানাচ্ছেন।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

