মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে রেখেছে ইরান, ফলে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল দ্রুত পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা কম।
তেহরান জানিয়েছে, তাদের সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানে জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ পথ দেওয়া হবে। তবে একই সঙ্গে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে—অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রণালী পার হওয়ার চেষ্টা করলে তা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
ইরানি সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলাকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে ইতোমধ্যে কিছু তেলবাহী জাহাজকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষক রিচার্ড মীড বলেন, যুদ্ধবিরতি বাস্তবে বড় কোনো পরিবর্তন আনেনি। তার মতে, “মূল বিষয় হলো অনুমতি—ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারছে না, ফলে আগের অবস্থাই কার্যত বহাল রয়েছে।”
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরুর পর থেকে প্রায় দুই হাজার জাহাজ ও বিশ হাজার নাবিক পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে আছে। এসব জাহাজের মধ্যে তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কার, পণ্যবাহী জাহাজ এবং পর্যটকবাহী ক্রুজ জাহাজও রয়েছে।
যদিও কিছু জাহাজ চলাচলের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তবুও অধিকাংশ জাহাজ মালিক এখনো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত তারা বড় আকারে জাহাজ চলাচল শুরু করতে আগ্রহী নন।
ইরানের ঘোষিত দশ দফা পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, প্রণালী দিয়ে যাতায়াত ইরানের সামরিক ব্যবস্থাপনার আওতায় থাকবে। এর ফলে আগের মতোই শুধুমাত্র “অশত্রুভাবাপন্ন” জাহাজ—অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়—এমন জাহাজই অনুমতি পাবে।
সংকীর্ণ এই প্রণালী দিয়ে গত কয়েক সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ২১টি জাহাজ চলাচল করেছে, যা যুদ্ধের আগে দৈনিক প্রায় ১৪০টির তুলনায় অনেক কম। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
এছাড়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী প্রতিটি জাহাজ থেকে সর্বোচ্চ বিশ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি আদায়ের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা ইরান ও ওমান আদায় করতে পারে।
সংঘাত শুরুর পর থেকে অঞ্চলে ২০টির বেশি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং কয়েকজন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি এখনো বড় উদ্বেগ হিসেবে রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা স্টিফেন কটন বলেন, যুদ্ধবিরতি ইতিবাচক হলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো স্পষ্ট নয়। তার মতে, “নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, কোন জাহাজ আগে যাবে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা না থাকলে আস্থা ফিরবে না।”
জাতিসংঘের সামুদ্রিক সংস্থার প্রধান আরসেনিও ডোমিঙ্গেজ জানিয়েছেন, নিরাপদ নৌযাত্রা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কাজ চলছে। তিনি নাবিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন।
বর্তমানে যে অল্পসংখ্যক জাহাজ চলাচল করছে, তারা নতুন একটি পথ ব্যবহার করছে, যা ইরানের জলসীমার ভেতরে উত্তর দিক দিয়ে লারাক দ্বীপের পাশ দিয়ে যায়। এই পথ ব্যবহার করে ইরান জাহাজগুলোকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে নজরদারি করতে পারছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন পথ ব্যবহারের ফলে প্রণালীর সক্ষমতা আরও সীমিত হয়ে পড়ছে। ফলে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চলাকালেও জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম।
এদিকে, শিপিং খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ফিরতে অনিচ্ছুক। অনেক কোম্পানি তাদের জাহাজকে ওই অঞ্চল এড়িয়ে চলার নির্দেশনা বহাল রেখেছে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতি সাময়িক স্বস্তি দিলেও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের সংকট কাটাতে এখনো সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

