TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকটে আন্তর্জাতিক দায়িত্ব প্রশ্নেঃ BRICS নীরব

ইরানের সাম্প্রতিক দেশজুড়ে বিক্ষোভ কেবল দীর্ঘদিনের অস্থিরতার আরেকটি অধ্যায় নয়। এটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ চাপ বা পরীক্ষা—উদীয়মান শক্তিগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির নৈতিক দিকসমূহ যাচাই করার মুহূর্ত।

 

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ থেকে ইরান অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে দেশজুড়ে উত্তাল। ইরানি রিয়াল মার্কিন ডলারের বিপরীতে ১৪ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছে, মূল্যস্ফীতি ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়।

তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে দোকানিদের ধর্মঘট দিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত দেশের সব প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক ক্ষোভ রাজনৈতিক বিদ্রোহে রূপ নেয়। জানুয়ারির মাঝামাঝি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অন্তত ২,০০০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন মানবাধিকার সংস্থা ও সংবাদমাধ্যম।

এই বিক্ষোভ ২০২২–২৩ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের তুলনায় ছোট হলেও অর্থনৈতিক ভিত্তিতে আরও অস্থিতিশীল। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংকট, ভর্তুকিযুক্ত বিনিময় হার তুলে নেওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনের কঠিন অবস্থা জনগণের হতাশা বাড়াচ্ছে। BRICS ব্লকের অন্যান্য সদস্যদের তুলনায় ইরানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক কম, আর মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি। এটি কোনো উত্থানশীল শক্তির চিত্র নয়, বরং ক্লান্ত রাষ্ট্রের চিত্র।

তবু এই ক্লান্ত রাষ্ট্রটিই এখন BRICS-এর সদস্য। ২০২৪ সালে ইরানের সদস্যপদ বহুমেরুত্ব ও গ্লোবাল সাউথের সংহতি নিয়ে উদযাপন করা হয়েছিল, কিন্তু শুরু থেকেই বিষয়টি বিতর্কিত ছিল। ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা বিভিন্ন কারণে বিরোধিতা করলেও চীন ও রাশিয়া ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিপরীতে কৌশলগত ভারসাম্য হিসেবে সমর্থন করেছে।

BRICS এখন কেবল ইরানের অর্থনীতি নয়, তার অভ্যন্তরীণ সংকটও মোকাবিলা করতে বাধ্য। ব্লকটি নিজেকে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার ন্যায়সংগত বিকল্প হিসেবে তুলে ধরলেও, প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের মুখে নীরবতা তাদের দাবিকে শূন্য করে দেয়। চীন শান্তি ও স্থিতিশীলতার আহ্বান জানিয়েছে, রাশিয়া সার্বভৌমত্বের কথা বলেছে, আর ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা শান্তির আহ্বান জানিয়ে সরাসরি সহিংসতা এড়িয়ে চলেছে।

ইরান সরকার তার দেশের ভিতরে অস্থিরতা বিদেশি প্ররোচনায় ঘটেছে বলে দাবি করে, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারে নীরব নয়। ইরান আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের সদস্য এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা আইন লঙ্ঘনের নথি লিপিবদ্ধ করেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হতে পারে—অর্থনৈতিক ক্ষোভ রাজনৈতিক সংকটের রূপ নিতে পারে। ইরান মিসর বা তিউনিসিয়ার মতো নয়; এটি সামরিকভাবে শক্তিশালী, আঞ্চলিকভাবে প্রোথিত এবং মস্কো ও বেইজিংয়ের সমর্থনে সুরক্ষিত। যেকোনো বাহ্যিক হস্তক্ষেপ আঞ্চলিক অগ্নিকাণ্ড এবং বিশ্ব তেলবাজারে বিশাল ধাক্কার ঝুঁকি তৈরি করবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি বিক্ষোভকারীদের জন্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন এবং তেহরানের সঙ্গে বৈঠক বাতিল করেছেন। বিপরীতে, BRICS অংশীদাররা সরাসরি মন্তব্য থেকে বিরত থেকে কূটনৈতিক সমাধান ও বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততার উপর মনোযোগ দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকট BRICS-এর নৈতিক সক্ষমতার পরীক্ষা। বহুমেরুত্ব বাস্তব হলেও, দায়িত্ব ও মানবিক নীতি এখনো অনুপস্থিত। সঠিকভাবে হ্যান্ডেল করলে এটি দেখাবে—বহুমেরুত্ব স্থিতিশীল হতে পারে। ব্যর্থ হলে প্রমাণ হবে—ক্ষমতা ছড়িয়ে গেলেও জবাবদিহিতা নেই।

উদীয়মান শক্তিগুলো যদি স্থিতিশীলতা ও মানবিকতা মেলাতে ব্যর্থ হয়, তবে ন্যায্য বিশ্বের প্রতিশ্রুতি কেবল ফাঁপা ঘোষণাই হয়ে থাকবে।

সূত্রঃ এম ই এম

এম.কে

আরো পড়ুন

এবার হজ পালন করলেন ১৮ লাখ হাজি

আসছে রাশিয়ার নির্বাচন, পুতিনের প্রতিদ্বন্দ্বীকে কারাগার হতে গুম

যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে নাগরিকদের সতর্কতা যুক্তরাজ্য, জার্মানি,কানাডার