ইরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি, সামুদ্রিক অবরোধ প্রত্যাহার এবং সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরান বর্তমানে কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে এবং এ কারণেই তারা দ্রুত একটি চুক্তিতে যেতে চাইছে।
এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছিলেন, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক সামুদ্রিক চলাচল পুনরায় চালু করা সম্ভব। শুক্রবার জাতিসংঘের বাইরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, প্রস্তাবটি কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছানো হয়েছে এবং এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি ওয়াশিংটনের হাতে।
ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানি তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহার এবং আটকে থাকা ইরানি সম্পদের একটি অংশ ছাড়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে হবে। এর বিনিময়ে ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেবে এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন আলোচনা শুরু করবে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিকল্পনায় আনুমানিক ১২ বিলিয়ন ডলারের জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছাড়ার বিষয়টিও রয়েছে।
আরাগচির বক্তব্য অনুযায়ী, পরিকল্পনার প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো সম্পন্ন করতে চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগবে। ষষ্ঠ দিনে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার কথা এবং সপ্তম দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতা নিয়ে আলোচনা শুরুর প্রস্তাব রয়েছে।
তবে ট্রাম্প শনিবার জানান, তিনি ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইউরোনিউজও জানিয়েছে, ইরানের সাত দিনের পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যানের কথা ট্রাম্প প্রকাশ্যে জানিয়েছেন।
এর আগে রয়টার্স জানায়, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ ও অবরোধ কমানোর বিনিময়ে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিল। তেহরানের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনকে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছিল।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের বাণিজ্যিকভাবে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে যাতায়াত করত। ফলে প্রণালিটি দীর্ঘ সময় বন্ধ বা সীমিত থাকলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানের এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ২২ সেপ্টেম্বর জানিয়েছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলমান রয়েছে এবং তিনি শেষ পর্যন্ত একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর আশা করছেন। একই সময়ে তিনি ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না বলেও অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
তবে নতুন সাত দিনের প্রস্তাব নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের প্রস্তাবটি জুনে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতার কাঠামোর সঙ্গে অনেকটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেই আগের সমঝোতাও পরে ভেঙে যায় এবং দুই পক্ষের মধ্যে আবার সামরিক উত্তেজনা শুরু হয়।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বারবার হামলা ও নিষেধাজ্ঞার কারণে তেহরানের ওয়াশিংটনের ওপর আস্থা কমেছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রণালিটির একটি মানচিত্র প্রকাশ করে সেটিকে ‘ট্রাম্প স্ট্রেইট’ নামে উল্লেখ করেছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
এ অবস্থায় ইরানের সাত দিনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর ওয়াশিংটন-তেহরান কূটনৈতিক উদ্যোগ কোন দিকে যায়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই পক্ষের প্রকাশ্য অবস্থান থেকে দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সূত্রঃ রয়টার্স
এমকে

