যুক্তরাজ্যে ইসলামবিদ্বেষমূলক অপরাধ বৃদ্ধি এবং সাম্প্রতিক সময়ে একটি বড় ইসলামিক সমাবেশে কট্টর-ডানপন্থী হামলার হুমকির ঘটনার পরও শুরু হয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় মুসলিম সম্মেলন জালসা সালানা। আয়োজকরা জানিয়েছেন, নিরাপত্তা জোরদার করে নির্ধারিত সময়েই সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে এবং হুমকির কারণে অনুষ্ঠান বাতিল বা স্থগিত করার কথা একবারও ভাবা হয়নি।
হ্যাম্পশায়ারের ২০৮ একর অস্থায়ী ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত তিন দিনের এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। শুক্রবার দোয়া, ধর্মীয় আলোচনা এবং আহমদিয়া মুসলিম জামাতের বিশ্বনেতা হযরত মির্জা মাসরুর আহমদের ভাষণের মাধ্যমে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। অনুষ্ঠানে যুক্তরাজ্যের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পাশাপাশি বিভিন্ন সংসদ সদস্য, বিশপ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অংশগ্রহণেরও কথা রয়েছে।
সম্মেলনের আয়োজক আহমদিয়া মুসলিম জামাত যুক্তরাজ্যের প্রধান রফিক হায়াত বলেন, সাম্প্রতিক নিরাপত্তা উদ্বেগ তাদের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলেনি।
তিনি বলেন, “একবারও না, এক সেকেন্ডের জন্যও আমরা অনুষ্ঠান বন্ধ বা স্থগিত করার কথা ভাবিনি।”
সম্মেলন ঘিরে কয়েকশ অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ, জরুরি সেবা সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় আরও জোরদার করা হয়েছে।
গত মাসে যুক্তরাজ্যের আরেকটি বড় ইসলামিক সমাবেশ সন্দেহভাজন কট্টর-ডানপন্থী হামলার হুমকির কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ করে দিতে হয়। ওই ঘটনায় ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যার মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্রের সন্দেহে তদন্ত চলছে।
রফিক হায়াত বলেন, আহমদিয়া মুসলিম জামাত দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ধরনের বৈরিতার মুখোমুখি হয়েছে। ১৯১৩ সালে যুক্তরাজ্যে কার্যক্রম শুরু করা এ সম্প্রদায় ১৯২৬ সালে লন্ডনে অন্যতম প্রথম উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মসজিদ নির্মাণ করে। তবে ১৯৯০-এর দশকে মর্ডেনে একটি মসজিদ নির্মাণের সময় ব্রিটিশ ন্যাশনাল পার্টির শত শত সমর্থক পরিকল্পনা সভার বাইরে বিক্ষোভ করেছিলেন।
তিনি জানান, সে সময় সংঘাতের পরিবর্তে স্থানীয় জনগণ, চার্চ, পুলিশ এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে নিয়ে নিয়মিত সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রথমদিকে পরিবেশ উত্তপ্ত থাকলেও বর্তমানে পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে প্রতি পাঁচ দিনে একটি করে মসজিদে হামলার ঘটনা ঘটছে। এছাড়া ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ১২ মাসে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে মুসলিমবিদ্বেষমূলক ঘৃণাজনিত অপরাধ ১৯ শতাংশ বেড়েছে।
রফিক হায়াতের মতে, ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করতে মুসলিমদের সমাজের মূলধারার মানুষের সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে হবে।
তিনি বলেন, “আমরা আমাদের সন্তানদের বলি, মুসলিম পরিচয় নিয়ে কখনও লজ্জা পাবে না। মানুষকে জানাতে হবে ইসলাম কী শিক্ষা দেয়।”
তিনি আরও বলেন, আহমদিয়া সম্প্রদায় শুধু কট্টর-ডানপন্থীদের কাছ থেকেই নয়, কিছু উগ্রপন্থী মুসলিম গোষ্ঠীর কাছ থেকেও নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ২০১৬ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে আহমদিয়া মুসলিম আসাদ শাহ ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত হামলায় নিহত হওয়ার ঘটনাও সেই বাস্তবতার একটি উদাহরণ।
তবে তিনি দাবি করেন, অধিকাংশ মানুষের সঙ্গে সরাসরি পরিচয় ও সংলাপ ভুল ধারণা দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। তার ভাষায়, একজন মানুষ যখন অন্য একজনকে কাছ থেকে জানার সুযোগ পায়, তখন ধর্ম বা গায়ের রঙ নয়, মানুষকেই দেখতে শেখে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

