TV3 BANGLA
ফিচারবাংলাদেশ

কাঁঠাল থেকে বিস্কুট বানিয়ে তাক লাগালেন ছাত্তারঃ বাড়ছে অনলাইন চাহিদা

কাঁঠালের রাজধানীখ্যাত গাজীপুরে প্রতিবছর মৌসুমে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল সংরক্ষণের অভাবে গাছেই পচে নষ্ট হয়। ভরা মৌসুমে বাজারে কাঁঠালের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দামও কমে যায়। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাগান মালিকদের এমন অভিযোগ থাকলেও এবার সেই সমস্যার সমাধানে নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন শ্রীপুরের উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া।

শ্রীপুর পৌরসভার বৈরাগীরচালা গ্রামের এই উদ্যোক্তা কাঁঠালের বহুমুখী ব্যবহার ও অপচয় রোধের চিন্তা থেকে তৈরি করেছেন ‘কাঁঠাল বিস্কুট’। এরই মধ্যে তিনি পণ্যটি বাজারজাত শুরু করেছেন। অনলাইনে বাড়ছে অর্ডার, পাশাপাশি নতুন এই বিস্কুট নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ।

গাজীপুরে প্রতিবছর ৯ হাজার ১০০ হেক্টরের বেশি জমিতে কাঁঠাল উৎপাদন হয়। এর মধ্যে শ্রীপুর উপজেলায় উৎপাদন হয় তিন হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে। উঁচু লাল মাটির কারণে শ্রীপুরের কাঁঠাল স্বাদ, মিষ্টতা ও মানের জন্য পরিচিত।

বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত গাজীপুরের বিভিন্ন বাগানে কাঁঠালের মৌসুম চলে। এ সময় গাছপাকা কাঁঠালে বাগান ও স্থানীয় বাজারগুলো ভরে যায়। কিন্তু পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই টনকে টন কাঁঠাল নষ্ট হয়।

আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া প্রযুক্তি ও জ্ঞান কাজে লাগিয়ে পাকা কাঁঠালের রস দিয়ে বিস্কুট তৈরি করছেন। এতে কাঁঠালের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। কৃত্রিম স্বাদ বা গন্ধের পরিবর্তে কাঁঠালের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই পণ্যটি তৈরি করা হচ্ছে।

কারখানায় প্রথমে পাকা কাঁঠাল থেকে কোষ বের করে ব্লেন্ড করা হয়। এরপর কাঁঠালের রসের সঙ্গে ঘি, মাখন, দুধ, ময়দা ও অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করা হয় মণ্ড। মণ্ডটি পরে বিশেষ ছাঁচে কেটে বিস্কুটের আকার দেওয়া হয়।

একটি ট্রেতে ৩৬টি বিস্কুট সাজানো হয়। এভাবে একটি ট্রলিতে ৩৬টি ট্রে একসঙ্গে রেখে চুল্লিতে দেওয়া হয়। প্রায় ২৫ মিনিট পর বিস্কুটগুলো বের করে ঠান্ডা করা হয়। পরে বাক্সজাত করে বাজারে পাঠানো হয়। প্রতিটি বাক্সে থাকে ৮৫০ গ্রাম বিস্কুট।

কারখানার প্রধান কারিগর মানিক মিয়া জানান, স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার না করেই বিস্কুট তৈরি করা হচ্ছে। উৎপাদন শেষে বিস্কুট ঠান্ডা করে প্যাকেটজাত করা হয়।

গত দুই মাস ধরে অনলাইনে কাঁঠালের বিস্কুটের অর্ডার আসছে। সংশ্লিষ্ট কুরিয়ারকর্মী রাকিব জানান, দিন দিন অর্ডারের পরিমাণ বাড়ছে। যারা একবার কিনছেন, তাদের অনেকেই আবার অর্ডার করছেন। নতুন ক্রেতার পাশাপাশি পুরোনো ক্রেতাদের কাছ থেকেও নিয়মিত অর্ডার আসছে।

উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া জানান, তিনি চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও জাপান ভ্রমণের সময় কাঁঠাল দিয়ে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি ও বাজারজাত করতে দেখেছেন। সেখান থেকেই কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করে নতুন খাদ্যপণ্য তৈরির ধারণা পান। ভবিষ্যতে কাঁঠালের চিপসসহ আরও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তার।

সরকার নতুন ধরনের এসব খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণে কর-সুবিধা দিলে উৎপাদন খরচ কমবে বলে মনে করেন ছাত্তার। এতে সুলভ মূল্যে এসব পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গাজীপুরের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে প্রচুর কাঁঠাল উৎপাদন হলেও প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল অপচয় হয়। এই অপচয় রোধে কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি জানান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণের ২০টিরও বেশি প্রযুক্তি ও উপকরণ উদ্ভাবন করেছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এসব প্রযুক্তি বিভিন্ন উদ্যোক্তার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক উদ্যোক্তা কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করে বাজারজাত করছেন।

ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরীর মতে, কাঁঠালের বীজ, কাঁচা কাঁঠাল ও পাকা কাঁঠাল শুকিয়ে তৈরি করা গুঁড়ায় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এসব গুঁড়া নির্দিষ্ট অনুপাতে আটা বা ময়দার সঙ্গে মিশিয়ে পাপড়, বিস্কুট, কেক, ক্যান্ডি ও আইসক্রিমসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা সম্ভব। পাকা কাঁঠালের পাল্প দিয়েও বিস্কুট ও কেক তৈরি করা যায়।

এ ধরনের খাদ্যপণ্য উৎপাদন বাড়লে উদ্যোক্তাদের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ার পাশাপাশি পারিবারিক আয়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় অবদান রাখার পাশাপাশি কাঁঠালের অপচয়ও কমানো সম্ভব হবে।

কাঁঠালচাষি নজরুল ইসলাম বলেন, শ্রীপুরসহ গাজীপুরে প্রতিবছর সংরক্ষণের অভাবে বাগানেই বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল নষ্ট হয়। প্রক্রিয়াজাত করে এসব কাঁঠাল বাজারজাত করা গেলে চাষিরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন। বিস্কুটের পাশাপাশি আরও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি হলে কাঁঠালের চাহিদা বাড়বে এবং চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

কাঁঠালকে শুধু মৌসুমি ফল হিসেবে বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রক্রিয়াজাত করে বছরজুড়ে বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি হলে এই ফলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে। শ্রীপুরের আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়ার কাঁঠালের বিস্কুট সেই সম্ভাবনাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

সূত্রঃ স্যোশাল মিডিয়া

এম.কে

আরো পড়ুন

সিলেট জেলা বিএনপির সেক্রেটারি ব্যবহার করছেন গণিমতের গাড়ি

বাংলাদেশের মাটির নিচে শত বছরের কয়লাঃ তবু বছরে ২৫ হাজার কোটি টাকার আমদানি

বিডিআর হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠন, যারা আছেন!