TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

কাজিন বিয়ে নিষিদ্ধ না করার সিদ্ধান্তে অনড় লেবারঃ যুক্তরাজ্যের ওপর মার্কিন চাপ

যুক্তরাজ্যে কাজিন বিয়ে নিষিদ্ধ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের সরকার আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস এই অবস্থানকে সরাসরি ‘সভ্যতাগত উদ্বেগ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে, যা লন্ডন ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্ডারসেক্রেটারি সারাহ রজার্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে স্টারমারের একটি ভিডিও শেয়ার করে সমালোচনা করেন।

ভিডিওতে দেখা যায়, গত বছরের মার্চে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে স্টারমার কাজিন বিয়ে নিষিদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিতে অস্বীকৃতি জানান। রজার্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ‘সভ্যতাগত উদ্বেগ’ বলতে ঠিক এই ধরনের নীতিগত ব্যর্থতাকেই বোঝানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন হোয়াইট হাউস ইউরোপে অভিবাসন ও সামাজিক কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯ পৃষ্ঠার মার্কিন নিরাপত্তা নথিতে সতর্ক করে বলা হয়, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে ইউরোপ ‘সভ্যতাগত বিলুপ্তি’র ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

যুক্তরাজ্যে কাজিন বিয়ে বর্তমানে বৈধ হলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই এর স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের ফলে শিশুদের মধ্যে সিকল সেল রোগ, সিস্টিক ফাইব্রোসিসসহ বিভিন্ন জেনেটিক রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এই প্রথা দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির কিছু অংশে তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।

কনজারভেটিভ পার্টির এমপি রিচার্ড হোল্ডেন,(যিনি কাজিন বিয়ে নিষিদ্ধে একটি ব্যক্তিগত সদস্য বিল উত্থাপন করেছেন) লেবার সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, এই প্রথা শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, বরং নারীর অধিকার, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং ‘বন্ধ কমিউনিটি’ তৈরির সঙ্গেও জড়িত। তার অভিযোগ, লেবার সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে এবং স্পষ্ট অবস্থান নিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

বিলটির দ্বিতীয় পাঠ সম্প্রতি হওয়ার কথা থাকলেও হাউস অব কমন্স না বসায় তা স্থগিত হয়ে যায়। হোল্ডেনের দাবি, সরকার চাইলে সহজেই বিলটি এগিয়ে নিতে পারত, কিন্তু রাজনৈতিক কারণে তা করা হয়নি।

এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে নারীর নিরাপত্তা ও অনার কিলিং প্রসঙ্গ। সারাহ রজার্স সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা তথ্যে দাবি করেন, কিছু দেশে কাজিন বিয়ের সঙ্গে অনার কিলিংয়ের সামাজিক বাস্তবতার যোগসূত্র রয়েছে। তার বক্তব্যে যুক্তরাজ্যের অনলাইন নিয়ন্ত্রণ নীতির প্রতিও কটাক্ষ করা হয়, বিশেষ করে এক্স প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করার সম্ভাবনা নিয়ে।

এর আগে, এনএইচএস ইংল্যান্ডের একটি নিবন্ধে কাজিন বিয়ের সম্ভাব্য ‘পারিবারিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা’ তুলে ধরায় ব্যাপক সমালোচনা হয় এবং পরে ক্ষমা চাওয়ার দাবি ওঠে। সমালোচকদের মতে, স্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করে এ ধরনের বক্তব্য জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বার্তা দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রে কাজিন বিয়ে ১৫টির বেশি অঙ্গরাজ্যে বৈধ হলেও, ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টিকে সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তাগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে এই প্রথা নিষিদ্ধে কোনো উদ্যোগ নেননি, তবুও যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে তার প্রশাসনের কঠোর ভাষা নজর কেড়েছে।

কাজিন বিয়ের হার যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশেই প্রায় ১ শতাংশে নেমে এলেও, যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ডের মতো কিছু এলাকায় এটি এখনও তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশেষ করে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত কমিউনিটির মধ্যে প্রথম বা দ্বিতীয় কাজিনের সঙ্গে বিয়ের হার উল্লেখযোগ্য।

সব মিলিয়ে, কাজিন বিয়ে ইস্যু এখন শুধু একটি সামাজিক বা স্বাস্থ্যগত বিতর্ক নয়; এটি যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যেও স্পষ্ট প্রভাব ফেলছে। স্টারমার সরকার এই চাপের মুখে অবস্থান পরিবর্তন করবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জল্পনা বাড়ছে।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

ওমিক্রন সম্পর্কে যা জানালো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

যুক্তরাজ্যের রেকর্ড সংখ্যক স্ট্রিমিং সাবস্ক্রিপশন বাতিল

অনলাইন ডেস্ক

বেতন বৃদ্ধির পরেও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে তাল মিলাতে ব্যর্থ ব্রিটিশ জনগণ