ব্রিটেনে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকের কয়েকজন কাউন্সিলর ও দলীয় প্রার্থীর বর্ণবাদী ও আপত্তিকর মন্তব্য গোপন ক্যামেরায় ধারণ করে প্রকাশ করেছে আইটিভি নিউজ। ফাঁস হওয়া ভিডিওতে কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের ‘পশু’ এবং মুসলিমদের ‘পরজীবী’ হিসেবে উল্লেখ করতে দেখা গেছে কয়েকজনকে। যুক্তরাজ্যের মোট জনসংখ্যার এক শতাংশের বেশি অশ্বেতাঙ্গ হওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেছেন দলের কয়েকজন ব্যক্তি।
বুধবার রাতে প্রকাশিত ভিডিওগুলোর একটিতে দক্ষিণ লন্ডনের রিফর্ম ইউকের এক কাউন্সিলর রাজা তৃতীয় চার্লসকে শিরশ্ছেদ করার কথা বলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার দাবি ছিল, রাজা একজন মুসলিম। এ ছাড়া সোলিহালে দলের কয়েকজন প্রার্থীর কথোপকথনেও আপত্তিকর মন্তব্য উঠে এসেছে। সেখানে একই এলাকায় দলটির হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া এক নারী প্রার্থীকে নিয়ে আলোচনা করার সময় এক পুরুষ কাউন্সিলর বলেন, ওই নারী তার নিজের মেয়ে হলেও বৃহস্পতিবার রাতে তাকে গোসল করানো হতো। মন্তব্যটির অর্থ ও প্রেক্ষাপট নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির চেয়ার ও নারী ও সমতা বিষয়ক মন্ত্রী ব্রিজেট ফিলিপসন এসব মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নাইজেল ফারাজের পক্ষে এসব ঘটনাকে কয়েকজন ‘খারাপ ব্যক্তি’র বিচ্ছিন্ন আচরণ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এমন ঘৃণ্য মন্তব্য করা রিফর্ম ইউকের প্রত্যেক কাউন্সিলর, নির্বাচনী প্রার্থী ও দলীয় সদস্যকে অবিলম্বে বহিষ্কারের দাবি জানান তিনি।
ফিলিপসন আরও বলেন, দলের সমর্থন নিয়ে যারা সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন, তাদের মধ্যে প্রকাশ্য বর্ণবাদী আচরণ কেন বারবার দেখা যাচ্ছে এবং ফারাজ কেন তা মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, তার ব্যাখ্যা দিতে হবে।
লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের নেতা স্যার এড ডেভিও ভিডিওগুলোর নিন্দা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ঘটনাগুলো উদ্বেগজনক। নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন বর্ণবাদ ও ঘৃণা ছড়িয়ে পড়তে দেখে যারা আতঙ্কিত হচ্ছেন, তাদের প্রতি তিনি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।
আইটিভির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভিডিওতে দেখা কয়েকজনকে দল থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে অথবা তারা দল ছেড়ে গেছেন। ব্রোমলির কাউন্সিলর ডিন মিলার, যিনি কৃষ্ণাঙ্গ শিশু ও রাজাকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করতে দেখা গেছে, তিনি রিফর্ম ইউকে থেকে পদত্যাগ করেছেন।
এদিকে, বুধবার প্রকাশিত ভিডিওর পর বৃহস্পতিবার সাউথএন্ডে নাইজেল ফারাজ ও দলের পুলিশবিষয়ক উপদেষ্টা কলিন সাটনের একটি সংবাদ সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও তা বাতিল করা হয়েছে। তবে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইটিভির প্রতিবেদন প্রকাশের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলন বাতিলের কোনো সম্পর্ক নেই।
রিফর্ম ইউকের এক মুখপাত্র বলেছেন, দলের সদস্য, কর্মী ও কাউন্সিলরদের কেউ অনুপযুক্ত আচরণ করলে তার তদন্ত শুরু হয়েছে। কয়েকজনকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছে। তবে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। তিনি দাবি করেন, দলটি সদস্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও উন্নত ও অগ্রাধিকারভিত্তিক করেছে। তারপরও কখনো কখনো দলের মূল্যবোধের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ব্যক্তিরা প্রাথমিক যাচাই পেরিয়ে যেতে পারেন। ভবিষ্যতে কেউ কী মন্তব্য করবেন, তা আগাম যাচাই করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে রিফর্ম ইউকেতে বর্ণবাদের কোনো স্থান নেই বলে দাবি করেন দলটির মুখপাত্র।
আইটিভির অনুসন্ধানী প্রামাণ্যচিত্র ‘আন্ডারকভার: আ ইয়ার ইন রিফর্ম’-এ এসব ভিডিওসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের কার্যক্রম তুলে ধরা হবে। ব্রিটেনজুড়ে এক বছর ধরে গোপনে ধারণ করা ফুটেজে দলটির ওয়েস্টমিনস্টার কার্যালয়ের ভেতরের ঘটনাও রয়েছে। দলীয় নেতৃত্বে থাকা ফারাজ তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চরমপন্থী, বর্ণবাদী ও উগ্র ব্যক্তিদের দল থেকে দূরে রাখতে পেরেছেন কি না, তা অনুসন্ধান করা হয়েছে প্রামাণ্যচিত্রটিতে। এটি ১৮ অক্টোবর রাত ১০টা ২০ মিনিটে আইটিভি ও আইটিভিএক্সে প্রচারের কথা রয়েছে।
সাম্প্রতিক এই ঘটনা নাইজেল ফারাজের দলের জন্য রাজনৈতিকভাবে নতুন চাপ তৈরি করেছে। গত দুই বছর জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা রিফর্ম ইউকে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক বিতর্কের মুখে পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যান্ডি বার্নহ্যাম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর লেবার পার্টি আবার জনমত জরিপে এগিয়ে গেছে। চলতি সপ্তাহের দুটি জরিপে কনজারভেটিভ পার্টিকেও দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্রঃ আইটিভি নিউজ
এমকে

