TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

খামেনি হত্যায় উল্টো ফলের আশঙ্কাঃ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিরতার সতর্কবার্তা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক সুবিধা আনতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে তা বড় ধরনের অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, নেতৃত্ব “শিরচ্ছেদ” কৌশল এ অঞ্চলে অতীতে স্থিতিশীলতা নয়, বরং বিশৃঙ্খলাই সৃষ্টি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু খামেনি হত্যাকে কৌশলগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন। তবে সমালোচকদের মতে, ৮৬ বছর বয়সী এক অসুস্থ নেতাকে সরিয়ে দেওয়া সামরিক সক্ষমতার প্রদর্শন হলেও তা কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল নিশ্চিত করে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খামেনির মৃত্যু মানেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অনুকূলে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হবে—এমনটি ধরে নেওয়া ভুল। বরং এর ফলে আরও কঠোরপন্থী নেতৃত্বের উত্থান বা অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের মাধ্যমে সহিংসতা বাড়তে পারে।

সাম্প্রতিক ইতিহাসে নেতৃত্ব হত্যার পরিণতি সুখকর হয়নি। ইরাকে সাবেক শাসক সাদ্দাম হোসেনকে অপসারণের পর ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। সেই শূন্যতার সুযোগে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান ঘটে এবং ইরাক আঞ্চলিক প্রক্সি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

নিরাপত্তা শূন্যতার সুযোগে উগ্রপন্থী সংগঠন আইএসআইএল বা আইএসআইএস-এর উত্থান ঘটে, যা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়। এতে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং ইউরোপমুখী বড় শরণার্থী সংকট তৈরি হয়।

ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের ক্ষেত্রেও একই ধারা দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠাতা শেখ আহমেদ ইয়াসিন ও পরবর্তী নেতা আবদেল আজিজ রানতিসিকে হত্যার পর সংগঠনটি দুর্বল না হয়ে বরং নতুন নেতৃত্বে পুনর্গঠিত হয়। পরে ইয়াহইয়া সিনওয়ারের নেতৃত্বে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়।

একইভাবে লেবাননের সংগঠন হিজবুল্লাহর সাবেক নেতা হাসান নাসরুল্লাহ নেতৃত্বে আসেন তার পূর্বসূরি আব্বাস আল-মুসাউইকে হত্যার পর। ফলে সংগঠনটি আরও শক্তিশালী অরাষ্ট্রীয় শক্তিতে রূপ নেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি আলোচনায় আগ্রহী হবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। মাস্কাট ও জেনেভায় পারমাণবিক আলোচনা চলাকালে ইরান কিছু বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল। নতুন নেতৃত্ব হয়তো সেই রাজনৈতিক পরিসর নাও পেতে পারে।

যদি ইরানে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু দেশটিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরাক ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতা বলছে, নিরাপত্তা শূন্যতা আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় মিত্রদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

নেতানিয়াহুর জন্য এ হত্যাকাণ্ড স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক লাভ বয়ে আনতে পারে। তবে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে লাভ ততটা স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের সময় দূরবর্তী এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই এই যুদ্ধকে “ইসরায়েলের যুদ্ধ” হিসেবে দেখছেন।

পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র স্থলবাহিনী মোতায়েন থেকে বিরত থাকলেও দীর্ঘ বিমান অভিযান একসময় শেষ করতে হবে। তখন অঞ্চলজুড়ে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে, তার ভার বহন করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেরই।

সব মিলিয়ে, নেতৃত্ব হত্যার মাধ্যমে দ্রুত সাফল্য দেখানো সম্ভব হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে না—বরং নতুন সংঘাতের বীজ বপন করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের অভিজ্ঞতা সেই সতর্কবার্তাই আবারও সামনে

সূত্রঃ আল–জাজিরা

এম.কে

আরো পড়ুন

গাজায় যুদ্ধে জড়িয়ে ভয়ংকর বিপদে ইসরায়েল

বিদেশি সহায়তা ও পাবলিক সম্প্রচারে ৯ বিলিয়ন ডলার কাটছাঁট অনুমোদন দিল মার্কিন সিনেট

সৌদিতে মুদির দোকানে যেসব পণ্য বিক্রি নিষিদ্ধ হলো