15.2 C
London
August 21, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিকযুক্তরাজ্য (UK)

গাজায় ত্রাণকর্মী হত্যার তদন্ত বন্ধঃ ইসরায়েলের সিদ্ধান্তে যুক্তরাজ্য-কানাডার তীব্র নিন্দা

গাজায় ত্রাণবাহী গাড়িবহরে হামলায় সাতজন মানবিক সহায়তাকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনায় ফৌজদারি তদন্ত না চালানোর ইসরায়েলি সামরিক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা। তিন দেশ যৌথ বিবৃতিতে সিদ্ধান্তটিকে ‘লজ্জাজনক’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি পাওয়ার অধিকার রাখে।

ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবিক সহায়তা সংস্থা ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের ত্রাণবাহী গাড়িবহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় সংস্থাটির সাত কর্মী নিহত হন। নিহতদের মধ্যে তিনজন ব্রিটিশ, একজন অস্ট্রেলীয়, একজন পোলিশ, একজন ফিলিস্তিনি এবং দ্বৈত মার্কিন-কানাডীয় নাগরিক ছিলেন। হামলাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়।

তিন দেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের সিদ্ধান্ত ‘অত্যন্ত সামান্য এবং অত্যন্ত বিলম্বিত’। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির জন্য চাপ দিয়ে আসছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফৌজদারি তদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নিহতদের পরিবার ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে গভীর হতাশার কারণ হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, নিহত ব্রিটিশ নাগরিক জন চ্যাপম্যান, জেমস হেন্ডারসন ও জেমস কিরবির পরিবারের জন্য তারা ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত। ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান হলো, এমন ঘটনায় কেবল অভ্যন্তরীণ সামরিক পর্যালোচনা যথেষ্ট নয়; নিহতদের পরিবারকে ন্যায়বিচার ও প্রকৃত জবাবদিহি দিতে হবে।

অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক জোমি ফ্র্যাঙ্ককমও ওই হামলায় নিহত হন। অস্ট্রেলীয় সরকার সিদ্ধান্তটিকে তীব্রভাবে নিন্দা করেছে। ফ্র্যাঙ্ককমের পরিবারও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্তকে অস্বচ্ছ ও অপর্যাপ্ত বলে সমালোচনা করেছে এবং স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন জানিয়েছে, হামলার আগে তাদের গাড়িবহরের চলাচল সম্পর্কে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছিল। গাড়িগুলোর ছাদে সংস্থার প্রতীকও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার কোনো গ্রহণযোগ্য অজুহাত ছিল না এবং তদন্ত বন্ধের সিদ্ধান্ত ঘটনার পূর্ণ সত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর দাবি, তাদের সেনারা গাড়িবহরের কয়েকজন ব্যক্তিকে ভুল করে হামাসের সশস্ত্র সদস্য হিসেবে শনাক্ত করেছিল। সামরিক বাহিনী আরও দাবি করেছে, ত্রাণবাহী গাড়িবহর পূর্বে সমন্বয় করা নির্ধারিত পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছিল।

ইসরায়েলি সামরিক তদন্তে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কমান্ডারদের সিদ্ধান্তে ফৌজদারি অপরাধের যুক্তিসংগত সন্দেহ তৈরি হয়নি। তবে ঘটনার পর দুই কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং আরও তিন কর্মকর্তাকে তিরস্কার করা হয়েছিল।

ইসরায়েলের এই সিদ্ধান্তে শুধু যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাই নয়, পোল্যান্ডও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। নিহতদের একজন ছিলেন পোলিশ নাগরিক দামিয়ান সোবোল। পোল্যান্ড ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে তদন্ত বন্ধের সিদ্ধান্তে ‘গভীর হতাশা’ প্রকাশ করেছে এবং নিজেদের তদন্তে ইসরায়েলের সহযোগিতা দাবি করেছে।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তা আবারও সামনে এসেছে। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই গাজায় ১৮৬ জন মানবিক সহায়তাকর্মী নিহত হয়েছেন। তিন দেশ বলেছে, যুদ্ধবিরতি থাকলেও গাজা এখনো ত্রাণকর্মীদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থানগুলোর একটি।

এদিকে গাজায় অন্যান্য প্রাণহানির ঘটনাকে কেন্দ্র করেও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তদন্ত নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রাজাব ও তার পরিবারের সদস্যদের নিহত হওয়ার ঘটনায় এবং ২০২৫ সালে ১৫ জন ফিলিস্তিনি প্যারামেডিক নিহত হওয়ার ঘটনায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ফৌজদারি তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে।

তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিজস্ব তদন্তব্যবস্থা কতটা স্বাধীন ও কার্যকর। এ ধরনের তদন্তের পর প্রকৃতপক্ষে কতজন সেনার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে।

ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের সাত কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনায় তদন্ত বন্ধের সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি পুরোনো হামলার বিচার-প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেনি; বরং যুদ্ধক্ষেত্রে মানবিক সহায়তাকর্মীদের নিরাপত্তা, সামরিক বাহিনীর জবাবদিহি এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রয়োগ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার প্রকাশ্য নিন্দা এবং পোল্যান্ডের কূটনৈতিক প্রতিবাদে বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আবারও গুরুত্ব পেয়েছে। নিহতদের পরিবারগুলোর দাবি—এটি শুধু একটি ‘দুঃখজনক ভুল’ হিসেবে শেষ না করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

চার্লসের রাজ্যাভিষেকে আসবেন প্রিন্স হ্যারি

সেনজেন বুলগেরিয়ার যোগদানে আপত্তি তুলে নিল নেদারল্যান্ডস

‘সবচেয়ে খারাপ’ হলেও ঘুরে দেখার মতো—লন্ডনের নিচের দশ কাউন্সিলের অজানা সৌন্দর্য