জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন এবার বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে আসছে। একই অধিবেশনে একদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো সরকারপ্রধান হিসেবে বিশ্বনেতাদের সামনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন। চার দশক পর এমন দ্বৈত ভূমিকা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আগামী ৮ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে শুরু হবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। এর উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—“আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ।” জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক শান্তি-নিরাপত্তাসহ বৈশ্বিক নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে এই অধিবেশনে বিশ্বনেতারা বক্তব্য দেবেন।
গত ২ জুন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের প্রার্থী হিসেবে ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ১৯০ ভোটের মধ্যে ৯৯ ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস. কাকৌরিসকে, যিনি ৯১ ভোট পেয়েছিলেন, পরাজিত করেন।
নির্বাচনের পর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, তার “অসাধারণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা” শুধু সাধারণ পরিষদের জন্য নয়, বরং পুরো জাতিসংঘের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের একটি পুরোনো অধ্যায়ও ফিরে এসেছে। ১৯৮৬-৮৭ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী একই সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। খলিলুর রহমান সে সময় তার ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজ করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খলিলুর রহমান এই অর্জনের কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের “অটল ও নিঃশর্ত” সমর্থনকে দিয়েছেন।
এবারের অধিবেশনের আরেকটি বড় আকর্ষণ হবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানিয়েছে, তিনি ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হবেন এবং ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য রাখবেন। এটিই হবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম নিউইয়র্ক সফর।
সফরের সময় তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। এছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে একাধিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করারও পরিকল্পনা রয়েছে।
এবারের অধিবেশনেও বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার থাকবে রোহিঙ্গা সংকট। গত ২০ জুন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী বলেছেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে দ্রুত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই এই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান।
রাষ্ট্রদূত চৌধুরী আরও বলেন, প্রায় এক দশক ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি বাংলাদেশের স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও জাতীয় সম্পদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। তাই নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একই অধিবেশনে একদিকে বাংলাদেশের একজন কূটনীতিক সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসন থেকে পুরো অধিবেশন পরিচালনা করবেন, অন্যদিকে দেশের সরকারপ্রধান প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে বক্তব্য দেবেন—এই সমন্বয় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।
সূত্রঃ স্যোশাল মিডিয়া
এম.কে

