TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে রিফর্ম সরকার ক্ষমতায় এলে ১০০ দিনে করছাড়ঃ ব্যর্থ হলে পদত্যাগ করবেন জেনরিক

রিফর্ম ইউকের ট্রেজারি-বিষয়ক মুখপাত্র রবার্ট জেনরিক নিজের রাজনৈতিক পদই ঝুঁকির মধ্যে রেখে বড় ধরনের করছাড়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রিফর্ম ইউকে সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে আয়করের করমুক্ত ব্যক্তিগত আয়সীমা ১৫ হাজার পাউন্ডে উন্নীত করতে ব্যর্থ হলে চ্যান্সেলরের পদ থেকে পদত্যাগ করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

বার্মিংহামে রিফর্ম ইউকের বার্ষিক সম্মেলনের শেষ দিনে দেওয়া বক্তব্যে জেনরিক জানান, ক্ষমতায় এলে দলের প্রথম বাজেটেই ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়সীমা বর্তমান ১২ হাজার ৫৭০ পাউন্ড থেকে বাড়িয়ে ১৫ হাজার পাউন্ড করা হবে। এই সীমা ২০২১ সাল থেকে অপরিবর্তিত রয়েছে এবং বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩১ সাল পর্যন্ত একই পর্যায়ে থাকার কথা।

রিফর্ম ইউকের হিসাব অনুযায়ী, এই করছাড়ের ফলে সাধারণ হারে আয়কর দেওয়া একজন করদাতার বছরে প্রায় ৫০০ পাউন্ড সাশ্রয় হতে পারে। প্রায় ২৯ লাখ মানুষ পুরোপুরি আয়করের আওতার বাইরে চলে আসতে পারেন এবং একটি সাধারণ কর্মজীবী দম্পতির ক্ষেত্রে বছরে প্রায় ১ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে।

দলটির হিসাবে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রথম বছরে প্রায় ১৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় হবে। পাঁচ বছর পর এই ব্যয় বেড়ে প্রায় ২১ বিলিয়ন পাউন্ডে দাঁড়াতে পারে।

জেনরিক এই পরিকল্পনাকে প্রায় ৪ কোটি মানুষের জন্য কর কমানোর উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার দাবি, এটি হবে ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপগুলোর একটি।

তবে শুধু বক্তব্য দেওয়াতেই থেমে থাকেননি জেনরিক। সম্মেলনে বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নাইজেল ফারাজকে উদ্দেশ করে লেখা একটি আনুষ্ঠানিক ‘পদত্যাগপত্র’-এর ছবি প্রকাশ করেন। চিঠিতে তিনি স্পষ্ট করেন, প্রতিশ্রুত করছাড় বাস্তবায়ন করতে না পারলে তার চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্বে থাকা উচিত হবে না।

চিঠিতে জেনরিক বলেন, ব্রিটিশ জনগণ এমন চ্যান্সেলর ও সরকারের ওপর বিরক্ত, যারা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়। ব্যবসায় কেউ ব্যর্থ হলে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়—রিফর্ম ইউকে সেই জবাবদিহির সংস্কৃতি ওয়েস্টমিনস্টারেও প্রতিষ্ঠা করতে চায় বলে জানান তিনি।

সম্মেলনের বক্তব্যে জেনরিক আরও কঠোর ভাষায় বলেন, তিনি যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিশ্রুত করছাড় বাস্তবায়ন করতে না পারেন, তাহলে তিনি পদত্যাগ করবেন। তার বক্তব্যের সারকথা ছিল—কোনো অজুহাত নয়, প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে তিনি দায়িত্বে থাকবেন না।

জেনরিকের এই ঘোষণার পেছনে রিফর্ম ইউকের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও রয়েছে। দলটি ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়সীমা ২০ হাজার পাউন্ডে উন্নীত করতে চায়। তবে জেনরিক জানিয়েছেন, অর্থনৈতিকভাবে সম্ভব হলে ধাপে ধাপে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো হবে।

রিফর্ম ইউকের কর পরিকল্পনা এমন সময়ে সামনে এলো, যখন দলটি রাজনৈতিক অনুদান নিয়ে বিতর্কের মধ্যে রয়েছে। চ্যানেল ফোর নিউজের একটি অনুসন্ধানে রিফর্মের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকে বিদেশি উৎসের অর্থের পরিচয় গোপন করার বিষয়ে আলোচনা করতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি পুলিশের কাছেও পাঠানো হয়েছে।

এই ঘটনায় রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ দলের বিরুদ্ধে কোনো আইন ভঙ্গের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কিছু মন্তব্যকে ‘পাবের আড্ডার মতো অসতর্ক কথা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দলের দুই জ্যেষ্ঠ সহযোগী ড্যান জুকস ও জেমস অরকে অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলাকালে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

জেনরিকের কর ঘোষণাকে লেবার পার্টি অবশ্য ভিন্নভাবে দেখছে। দলটির অভিযোগ, রিফর্ম ইউকে নিজেদের অনুদান-সংক্রান্ত বিতর্ক থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতেই করছাড়ের ঘোষণা সামনে এনেছে। একই সঙ্গে লেবার সতর্ক করেছে, কর কমানোর অর্থ জোগাতে যে সরকারি ব্যয় কমানোর কথা বলা হচ্ছে, তার প্রভাব স্কুল, হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি সেবায় পড়তে পারে।

রিফর্ম ইউকে অবশ্য বলছে, তাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কর্মজীবী মানুষের হাতে আরও বেশি অর্থ রাখা হবে। দলটির বৃহত্তর অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে কল্যাণ ভাতা, বৈদেশিক সহায়তা ও সরকারি ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের কাটছাঁটের পরিকল্পনাও রয়েছে।

জেনরিকের এই ঘোষণার রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। নিজের পদত্যাগের অঙ্গীকার লিখিতভাবে প্রকাশ করে তিনি রিফর্ম ইউকেকে এমন একটি দল হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন, যারা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে শুধু নির্বাচনী বক্তব্য হিসেবে নয়, বরং বাস্তবায়নের জন্য বাধ্যতামূলক অঙ্গীকার হিসেবে দেখে।

এখন বড় প্রশ্ন হলো—রিফর্ম ইউকে ক্ষমতায় এলে ১০০ দিনের মধ্যে ১৫ হাজার পাউন্ড করমুক্ত আয়সীমা বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না। কারণ জেনরিক ইতোমধ্যেই নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে এই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে ফেলেছেন। ব্যর্থ হলে তার নিজের ঘোষণাই অনুযায়ী, চ্যান্সেলরের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হবে তাকে।

সূত্রঃ ডেইলি এক্সপ্রেস

এম.কে

আরো পড়ুন

ব্রিটেনে অমানবিক আচরণ ও যৌন হয়রানির শিকার নারী আশ্রয়প্রার্থীরাঃ প্রতিবেদন

যুক্তরাজ্যে লেবার সরকারের কড়াকড়িতে আতঙ্কিত হাজারো বাংলাদেশি অভিবাসী

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে চাপে পড়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী