21.9 C
London
August 30, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কায় যুক্তরাজ্যঃ যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করলেই ব্রিটিশদের হতে পারে প্রকাশ্য অপমান

রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা এবং ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠার মধ্যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হলে যুক্তরাজ্যে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ চালু করা হতে পারে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানানো ব্যক্তিদের জন্য আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি সামাজিক চাপ ও জনসমক্ষে অপমানের আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে।

ডেইলি এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্ণমাত্রার বৈশ্বিক যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলে ঐতিহাসিক নজির অনুযায়ী যুক্তরাজ্যে আবারও বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালুর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমানে যুক্তরাজ্য সরকার বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন কোনো ঘোষণা প্রতিবেদনে নেই।

প্রতিবেদনটির পটভূমিতে রয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইউরোপের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উদ্বেগ। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাজ্যের দৃঢ় সমর্থনের কারণে রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি নিয়ে দেশটির নিরাপত্তা মহলে উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা নিয়েও সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

যদি ভবিষ্যতে যুদ্ধের পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ প্রয়োজন হয়, তাহলে সামরিক সেবা প্রত্যাখ্যানকারীদের বিষয়টি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যে এ ধরনের ব্যক্তিদের ‘বিবেকগত আপত্তিকারী’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানানো ব্যক্তিদের বিশেষ ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে নিজেদের সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে হতো। তাদের আপত্তি গ্রহণযোগ্য হলে নির্দিষ্ট ধরনের সামরিক অব্যাহতি দেওয়া হতো এবং যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত অ-যুদ্ধমূলক দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হতো। যুক্তরাজ্যের সংসদের ঐতিহাসিক তথ্যেও এই ব্যবস্থার উল্লেখ রয়েছে।

তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পরিস্থিতি ছিল আরও কঠোর সামাজিক চাপপূর্ণ। সামরিক বাহিনীতে যোগ না দেওয়া পুরুষদের প্রকাশ্যে ‘কাপুরুষ’ হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য ‘সাদা পালক অভিযান’ পরিচালিত হয়েছিল। রাস্তাঘাট, গণপরিবহন ও বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে সামরিক পোশাক না পরা পুরুষদের হাতে সাদা পালক তুলে দিয়ে তাদের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হতো।

সাদা পালককে তখন কাপুরুষতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রচারণাটির উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক লজ্জা ও জনমতের চাপ সৃষ্টি করে পুরুষদের সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে উৎসাহিত করা। ইতিহাসবিদদের মতে, এই প্রচারণার কারণে এমন ব্যক্তিরাও সামাজিকভাবে অপমানিত হয়েছিলেন, যারা শারীরিক অসুস্থতা, আঘাত, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা অন্য বৈধ কারণে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে পারেননি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এই সামাজিক চাপের নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও ঐতিহাসিক নথিতে আলোচনা রয়েছে। এমনকি যুদ্ধ থেকে অব্যাহতি পাওয়া বা আহত সৈনিকদেরও কখনও ভুল করে সাদা পালক দেওয়া হয়েছিল। ফলে কেবল সামরিক সেবা প্রত্যাখ্যানকারীরাই নয়, যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা সৈনিকরাও এই প্রচারণার শিকার হয়েছিলেন।

আধুনিক সময়ে অবশ্য বিবেকগত কারণে সামরিক সেবা প্রত্যাখ্যানের অধিকার ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আইনগত স্বীকৃতি পেয়েছে। যুক্তরাজ্য সরকারের ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা ব্যবস্থার তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, সক্রিয় বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালু থাকা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে বিবেকগত কারণে সামরিক সেবা প্রত্যাখ্যানকারীদের জন্য কোনো না কোনো আইনি ব্যবস্থা রয়েছে।

ফিনল্যান্ডে পুরুষদের সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক হলেও বিবেকগত আপত্তি থাকা ব্যক্তিদের জন্য অ-সামরিক সেবার সুযোগ রয়েছে। গ্রিসেও একই ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে বিবেকগত আপত্তিকারীদের জন্য সামরিক ও বেসামরিক সেবার আলাদা মেয়াদ নির্ধারিত থাকে।

ফলে ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যে কোনো ধরনের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালু হলেও, সামরিক কার্যক্রমে অংশ নিতে নৈতিক বা বিবেকগত আপত্তি থাকা ব্যক্তিদের বিষয়টি সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর মাধ্যমে সমাধান করার পরিবর্তে আইনি ও বিকল্প সেবার কাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ‘সাদা পালক অভিযান’-এর ইতিহাস সামনে এনে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, যুদ্ধের মতো জাতীয় সংকটের সময়ে সামরিক বাহিনীতে যোগ না দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সামাজিক বিরূপতা তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞ ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির মূল শিক্ষা হলো, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা এবং ব্যক্তির বিবেকগত অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সামরিক সেবায় অংশগ্রহণের জন্য অতিরিক্ত সামাজিক চাপ কখনও কখনও বৈধভাবে অব্যাহতি পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদেরও অন্যায়ভাবে অপমানের মুখে ফেলতে পারে।

এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা এবং ইউরোপের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি বাড়তে থাকায় যুক্তরাজ্যে সামরিক প্রস্তুতি ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা থাকলেও যুক্তরাজ্যে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ পুনরায় চালুর কোনো নিশ্চিত সরকারি সিদ্ধান্ত এখনো নেই।

ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাজ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৬ সালে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ১৯৩৯ সালে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালু হয়েছিল। পরবর্তীতে এটি ১৯৬৩ সালে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা হয়।

সূত্রঃ ডেইলি এক্সপ্রেস

এম.কে

আরো পড়ুন

শিশুদের স্বাস্থ্যে লাগাম টানতে জাঙ্ক ফুড বিজ্ঞাপনে যুক্তরাজ্যের নতুন নিষেধাজ্ঞা

যুক্তরাজ্যে মাতৃত্বকালীন সেবার বিল ১০,০০০ পাউন্ড— অসহায় এক আশ্রয়প্রার্থীর করুণ কাহিনী

বাজারে আসছে রাজা চার্লসের প্রতিকৃতি সম্বলিত নতুন ব্যাংক নোট