TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

টানা তাপপ্রবাহে পুড়ছে যুক্তরাজ্য, ইতিহাসের সবচেয়ে শুষ্ক জুলাইয়ের মুখে ইংল্যান্ড ও ওয়েলস

টানা তাপপ্রবাহ, অস্বাভাবিক খরা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যুক্তরাজ্য নজিরবিহীন পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। দেশটির অর্ধেক ইংল্যান্ড এবং পুরো ওয়েলসকে আনুষ্ঠানিকভাবে খরাপীড়িত অঞ্চল ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের জুলাই মাস ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ইতিহাসে সবচেয়ে শুষ্ক জুলাই হিসেবে রেকর্ড হতে যাচ্ছে।

ইংল্যান্ডের পরিবেশ সংস্থা এবং ওয়েলসের প্রাকৃতিক সম্পদ কর্তৃপক্ষ এ সপ্তাহে খরা ঘোষণা করেছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটি তৃতীয়বারের মতো এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মে মাস থেকে শুরু হওয়া টানা চারটি রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে আরও তীব্র করে তুলেছে। এর ফলে দাবানল বেড়েছে, কৃষিজমিতে পানির সংকট দেখা দিয়েছে এবং বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষিত প্রাকৃতিক এলাকাগুলো হুমকির মুখে পড়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে ইংল্যান্ডে দীর্ঘমেয়াদি গড় বৃষ্টিপাতের মাত্র ৭ শতাংশ বৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণ ইংল্যান্ডে এ হার নেমে এসেছে মাত্র ১ শতাংশে। ফলে পার্ক, খেলার মাঠ, সংরক্ষিত এলাকা এবং বিস্তীর্ণ তৃণভূমির ঘাস শুকিয়ে বাদামি হয়ে গেছে। রিডিং এলাকায় টেমস নদীর পানির স্তর ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

বর্তমানে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ মানুষ বাগানে পাইপ দিয়ে পানি ব্যবহারে সরকারি নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। তবে শীতকালে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হওয়ায় জলাধারগুলো এখনো তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে। তাই আপাতত পানীয় জলের সরবরাহে সংকটের আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, এটি বর্তমানের বাস্তবতা। একসময়ের সবুজে মোড়া ব্রিটিশ প্রাকৃতিক দৃশ্য এখন অনেক জায়গায় শুকিয়ে বাদামি হয়ে গেছে। দেশটির জাতীয় আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৭০ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যের গ্রীষ্মকাল ১৯৯০ সালের তুলনায় এক থেকে ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি উষ্ণ এবং ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি শুষ্ক হতে পারে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ুবিজ্ঞানী ডক্টর ক্লোই ব্রিমিকম্ব বলেন, দীর্ঘদিনের শুষ্ক আবহাওয়া, তীব্র তাপপ্রবাহ ও দাবানল একে অপরকে আরও শক্তিশালী করছে। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো ভবিষ্যতের সমস্যা নয়, এটি এখনকার বাস্তব চ্যালেঞ্জ। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও অভিযোজন ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপজুড়ে এখন এমন আবহাওয়া দেখা যাচ্ছে, যেখানে অল্প সময়ের ব্যবধানে অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘ শুষ্ক সময় পালাক্রমে দেখা দেয়। এতে প্রথমে গাছপালা দ্রুত বেড়ে ওঠে, পরে প্রচণ্ড গরমে শুকিয়ে গিয়ে দাবানলের জন্য আদর্শ জ্বালানিতে পরিণত হয়।

শুধু জুলাই মাসেই ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ৩৯৩টি দাবানলের ঘটনায় দমকল বাহিনীকে সাড়া দিতে হয়েছে, যা এক মাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড। দাবানলের কারণে শত শত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্কটল্যান্ডের কেয়ার্নগর্মস জাতীয় উদ্যানে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। উত্তর ওয়েলসের রাইনোগিড পর্বতমালার আগুনের ধোঁয়া মহাকাশ থেকেও দেখা গেছে।

খরার প্রভাব পড়েছে কৃষিতেও। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা নির্ধারিত সময়ের আগেই ফসল কাটতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, পর্যাপ্ত পানি না পেলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফসল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

ডেভনের একটি জৈব কৃষি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ ও কারিগরি বিভাগের পরিচালক লুক কিং বলেন, পানির সংকটের পাশাপাশি তীব্র তাপমাত্রা ফসলের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। প্রতিষ্ঠানের চারটি জলাধারের মধ্যে তিনটিই ইতোমধ্যে শুকিয়ে গেছে, যা বছরের এত শুরুতেই আগে কখনো ঘটেনি। তিনি জানান, এখন ভোরে ফসল সংগ্রহ করতে হচ্ছে এবং সীমিত পানি কোন ফসলে ব্যবহার করা হবে, সে সিদ্ধান্তও অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, দীর্ঘ খরার কারণে বহু শতাব্দী ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও আবার দৃশ্যমান হয়েছে। ওয়েলসের কেয়ারহুনের রোমান দুর্গ, ডার্বিশায়ারের চ্যাটসওয়ার্থ প্রাসাদের ১৭শ শতকের বাগানের নকশাসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার চিহ্ন শুকিয়ে যাওয়া জমিতে আবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাজ্যে ভবিষ্যতে খরা, তাপপ্রবাহ এবং দাবানলের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ও আরও তীব্র আকারে দেখা দেবে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

বাই টু লেট টপ স্লাইসিং

নিউজ ডেস্ক

যুক্তরাজ্যে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমাতে পরিবারদের জন্য £১৩০ সহায়তা ঘোষণা

পূর্ণিমার চাঁদেই নির্ধারিত ইস্টারের তারিখঃ যুক্তরাজ্যে ২ এপ্রিল পিংক মুন, ৫ এপ্রিল উৎসব