ইরানের গোপন পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় নাগরিকদের প্রস্তুত থাকতে বলছে দেশটির সরকার। সম্ভাব্য পারমাণবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় নাগরিকদের জন্য বিশেষ নির্দেশনাসংবলিত ভিডিও প্রকাশের পাশাপাশি পারমাণবিক স্থাপনার আশপাশে বসবাসকারীদের মধ্যে আয়োডিন ট্যাবলেট বিতরণ করছে তেহরান।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সান-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের অত্যন্ত সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ ধ্বংস করার হুমকি দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। দেশটির সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে পারমাণবিক বিপর্যয়ের সময় নাগরিকদের তিনটি নির্দেশনা দিয়েছে—ঘরের ভেতরে আশ্রয় নিতে হবে, সেখানেই অবস্থান করতে হবে এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারি নির্দেশনা শুনতে হবে।
ভিডিওতে সতর্ক করা হয়েছে, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে হামলা হলে বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় মাটি ও পাথর বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। শক্তিশালী বাতাসের মাধ্যমে এসব তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা কয়েক শ মাইল দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্থাপনাটির সবচেয়ে কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের হাতে তেজস্ক্রিয় দূষণ ছড়িয়ে পড়ার আগে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় থাকতে পারে বলে ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দ্য টাইমসকে জানিয়েছেন, পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর আশপাশে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে আয়োডিন ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিটি যুদ্ধের সময় পারমাণবিক স্থাপনার দুই থেকে তিন কিলোমিটার এলাকার মধ্যে এসব ট্যাবলেট বিতরণের চেষ্টা করেছে সরকার। ট্রাম্পকে আর বিশ্বাস করা যায় না উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, তিনি শেষ পর্যন্ত এমন হামলা চালিয়ে দিতে পারেন।
ইরানের মধ্যাঞ্চলে নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার কাছাকাছি কোলাং পর্বতের ৩০০ ফুটেরও বেশি গভীরে অবস্থিত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন। ধারণা করা হচ্ছে, পাহাড়ের গভীরে নির্মিত সুড়ঙ্গের মধ্যে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক অবকাঠামো এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের যন্ত্রপাতি রাখা হয়েছে।
গত জুলাইয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ইরান পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের গভীর সুড়ঙ্গে হাজার হাজার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সেন্ট্রিফিউজ সরিয়ে নিয়েছে। নতুন আয়াতুল্লাহর অধীনে দেশটির শীর্ষস্থানীয় পারমাণবিক বিজ্ঞানীরাও সেখানে কাজ করছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে স্থাপনাটির ভেতরে কী চলছে, সে বিষয়ে ইরান এর আগে বলেছিল, ‘এটি আপনাদের জানার বিষয় নয়।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ের গভীরে নির্মিত এই স্থাপনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর তুলনায় অনেক বেশি সুরক্ষিত হতে পারে।
মঙ্গলবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করেছে। তবে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে হামলার প্রয়োজন হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ট্রাম্পের দাবি, চাইলে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই যেকোনো সময় এই স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব।
তিনি আরও দাবি করেন, আগের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ইরানের সামরিক বাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। দেশটির ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও সীমিত এবং নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা কমে গেছে।
এদিকে, চলতি সপ্তাহে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) টেলিগ্রামে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের ভেতরে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী যানবাহনের দৃশ্য তুলে ধরেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে হামলার হুমকির মধ্যেই এই ভিডিও প্রকাশ করা হলো।
সূত্রঃ দ্য সান, দ্য টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ফক্স নিউজ
এমকে

