মার্কিন ডলারের বিপরীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুদ্রার ওপর যখন অবমূল্যায়নের চাপ তৈরি হয়েছে, তখন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশি টাকা। সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও দেখা গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে অবমূল্যায়নের পর এই পরিবর্তন এসেছে এমন এক সময়ে, যখন দক্ষিণ এশিয়া ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ডলারের বিপরীতে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার মূল্য প্রায় ০.০৬ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ভারতের রুপি প্রায় ৯.৫ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার রুপি ১০ শতাংশের বেশি এবং ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়াহ প্রায় ৯ শতাংশ দুর্বল হয়েছে। ফলে আঞ্চলিক মুদ্রাগুলোর তুলনায় বাংলাদেশি টাকা উল্লেখযোগ্যভাবে স্থিতিশীল অবস্থান ধরে রেখেছে।
তথ্য বলছে, ২০২১ সাল থেকে কয়েক বছর ধরে টাকার ওপর ধারাবাহিক অবমূল্যায়নের চাপ ছিল। ওই সময়ে ডলারের বিনিময় হার ৮৫ টাকা ৮০ পয়সার কাছাকাছি থেকে বেড়ে একপর্যায়ে ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় পৌঁছায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। আগস্টের শেষদিকে ডলারের দর ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় পৌঁছানোর পর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তা ১২৩ টাকার কাছাকাছি নেমে আসে।
টাকার এই স্থিতিশীলতার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। বছরটিতে রেমিট্যান্সের পরিমাণ প্রায় ৩৫.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ায় ডলারের বাজারে চাপ কমাতে এটি ভূমিকা রেখেছে।
রেমিট্যান্সের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের ওপরে ছিল। এক বছর আগে একই সময়ে এই রিজার্ভ ছিল প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। রিজার্ভ বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক লেনদেনে বাংলাদেশের সক্ষমতা আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে।
বিনিময় হার ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থার দিকে এগিয়েছে। এর ফলে ডলারের দাম নির্ধারণে বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের ভূমিকা বেড়েছে। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিও টাকার ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করেছে।
অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতি এবং তুলনামূলক কম আমদানি চাহিদার কারণে ডলারের অভ্যন্তরীণ চাহিদাও কিছু সময় কম ছিল। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হওয়ার সুযোগ হয়েছে। তবে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি বাড়লে ডলারের চাহিদা আবারও বাড়তে পারে বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
টাকার স্থিতিশীলতার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আমদানি ব্যয়ের ওপর। ডলারের বিপরীতে টাকা শক্তিশালী থাকলে একই পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার পণ্য কিনতে স্থানীয় মুদ্রায় তুলনামূলক কম অর্থ প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে। বিদেশি মুদ্রায় নেওয়া ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের ক্ষেত্রেও শক্তিশালী টাকা স্থানীয় মুদ্রায় ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি করে।
দীর্ঘ সময়ের অবমূল্যায়নের পর ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার এই স্থিতিশীলতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রেকর্ড রেমিট্যান্স, বাড়তে থাকা রিজার্ভ এবং পরিবর্তিত বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এই অবস্থানের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সূত্রঃ বাংলাদেশ ব্যাংক, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
এমকে

