ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে চলছে চরম অস্থিরতা। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এসব শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জমি দখল ও মাদক কারবারের মতো গুরুতর অপরাধ চলছেই। সেখান থেকে উপার্জনকৃত টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়েও আবার খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়ছে তাদের ক্যাডাররা। এরই মাঝে মিরপুরে গড়ে উঠেছে ফোর স্টার নামে আন্ডারওয়ার্ল্ডের নতুন একটি গ্রুপ।
এই গ্রুপের ভয়ে তটস্থ মিরপুরের বাসিন্দারা। এ ছাড়া জামিনে মুক্ত হয়ে মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, ফার্মগেট, মতিঝিল, মগবাজার ও পুরান ঢাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মরিয়া ‘ধরিয়ে দিলে পুরস্কার’ ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কয়েকজন। তাদের রেশারেশির জেরে গত বছরের ১০ নভেম্বর আদালতপাড়ায় খুন হন শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন। এর আগেও তাকে হত্যাচেষ্টা করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইমন গ্রুপের সদস্যরা। সর্বশেষ মঙ্গলবার রাতে খুন করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটনকে।
টিটন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের স্ত্রীর বড় ভাই বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের নাম উঠে এসেছে। ফলে টিটন হত্যার প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে উঠবে ইমন, এমনটাই ধারণা করছে গোয়েন্দারা। এমন পরিস্থিতিতে অপরাধীদের গ্রেপ্তারে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দারা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে আমাদের দুই ধরনের পুলিশিং ব্যবস্থা চলমান। আমরা গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করেছি। এ ব্যাপারে নানামুখী প্রচেষ্টা অব্যাহত। সেখানে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতার বিষয়টি সামনে এসেছে। তথ্য যাচাইয়ের পর দ্রুতই অ্যাকশনে যাবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর জামিন পাওয়া সন্ত্রাসীদের অনেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে গেছে। তাদের কেউ কেউ এরই মধ্যে দেশে ফিরেছে। অনেকেই চেষ্টা চালাচ্ছে দেশে ফেরার। কেউ কেউ কারাগারে বসেই নির্দেশনা দিচ্ছে দেশকে অস্থিতিশীল করার। জামিনে বেরিয়ে এসে যারা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছিল তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কিলার আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন ও খোরশেদ আলম ওরফে রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু।
এর মধ্যে টিটনকে মঙ্গলবার রাতে হত্যা করা হয়েছে। এর আগে আধিপত্য বিস্তারকে ঘিরে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। রায়েরবাজারে দুই যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় নাম উঠে এসেছে পিচ্চি হেলালের। মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, এলিফ্যান্ট রোডসহ আশপাশের এলাকার অপরাধজগতে পিচ্চি হেলালের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইমন।
এলিফ্যান্ট রোডের বিপণিবিতান মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের সামনে ব্যবসায়ী এহতেশামুল হককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখমের ঘটনায় ইমনের লোকজন জড়িত বলে জানা গেছে। জামিন পওয়ার পর ইমন থাইল্যান্ড চলে গেলেও তার অপতৎপরতা থেমে নেই। আহত ব্যবসায়ী পিচ্চি হেলালের পরিচিত বলে পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে। ওই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে ও বছিলা পশুরহাটের ইজারাকে কেন্দ্র করে ইমনের স্ত্রীর বড় ভাই টিটনকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্র মতে, চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনে ঢাকায় অন্তত ১৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। গত জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাসে রাজধানী ঢাকায় ১০৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে মার্চে ৩৩টি হত্যাকাণ্ড হয়। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারিতে ৩৮ ও জানুয়ারিতে খুনের ঘটনা ঘটে ৩৬টি। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সারা দেশে ৮৫৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। আর ফেরুয়ারিতে ২৫০ ও মার্চে খুন হয় ৩১৭টি।
জানা গেছে, এলাকাভিত্তিক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে রয়েছে আবার গ্রুপ-উপগ্রুপ। এ নিয়েও রয়েছে অস্থিরতা। সানজিদুল ইসলাম ইমন, সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ ও ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলালের গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির খবর বারবার সামনে আসছে। এরপর চলতি বছরের মাঝামাঝিতে কুষ্টিয়া থেকে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। নজরদারি রাখা হয় আরও কয়েকজনকে।
বিষয়টি টের পেয়ে দেশ ছাড়েন পিচ্চি হেলাল। যদিও এর আগেই তাকে দুই দফা হত্যাচেষ্টা চালায় ইমন গ্রুপের সদস্যরা। একইভাবে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তেজগাঁও সাতরাস্তায় (আদালতপাড়ায় নিহত) মামুনকে লক্ষ্য করেও গুলি করে ইমন গ্রুপের সদস্যরা। তখন ইমন কারাগারে বন্দি ছিল। ওই ঘটনায় মামুন আহত হলেও পথচারী ভুবন চন্দ্র শীল নিহত হয়। এরপর আত্মগোপনে চলে যায় মামুন। বাড্ডা এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন। আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে আদালতপাড়ায় তিনি খুন হন।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র মতে, আদালতপাড়ায় নিহত মামুন একসময় ইমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। তবে তার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের দ্বন্দ্ব চলছিল। দীর্ঘ ২৪ বছর জেল খাটার পর ২০২৩ সালে মামুন জেল থেকে বের হন। আর ৫ আগস্টের পর বের হয়ে মামুনকে খুন করতে মরিয়া হয়ে ওঠে ইমন।
কারণ শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন ও মামুন একসময় হাজারীবাগ, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও এলাকার আতঙ্ক ছিলেন। তাদের গড়ে তোলা বাহিনীর নাম ছিল ‘ইমন-মামুন’ বাহিনী। তারা দুজনই চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ও সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যা মামলার আসামি। ২০২৩ সালে মামুন জেল থেকে বের হয়ে এসব এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয় ইমন।
সূত্র মতে, একদিকে জেল থেকে বের হয়ে অথবা দেশে ফিরেই এলাকায় একক রাজত্ব করতে চাচ্ছেন তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। অপরদিকে এক সময়ে এসব সন্ত্রাসীর নির্দেশে যারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে এসেছেন তারাও এলাকার কর্তৃত্ব ছাড়তে নারাজ। কারণ দখল, চাঁদাবাজি, খুনোখুনি, ভাড়ায় খাটা, আধিপত্যের লড়াইসহ নানা অপকর্মের মাঠ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রক তারাই। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সময়ে দলছুট ক্যাডারদের কাছে টেনে নিচ্ছেন ৫ আগস্টের পর মুক্তি পাওয়া ও দেশে ফিরে আসা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা।
বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা, চাঁদার ভাগ বাড়ানো ও এলাকার নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়াসহ অত্যাধুনিক অস্ত্র হাতে তুলে দেওয়ারও প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। এরই মাঝে মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন, ইব্রাহিম, শাহাদাত ও মুক্তার মিলে গড়ে তুলেছে ভয়ংকর ‘ফোর স্টার গ্রুপ’। এই সন্ত্রাসী গ্রুপটির গডফাদাররা বিদেশে থাকলেও দেশে নির্বিঘ্নে চলছে তাদের অপরাধ সাম্রাজ্য। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তাদের হয়ে দেশে মাটিতে কাজ করছে প্রায় ১০০ স্থানীয় সন্ত্রাসী।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর এখন পর্যন্ত শুধু মিরপুর জোনে হত্যার শিকার হয়েছে অন্তত ৫৭ জন। এর মধ্যে শুধু পল্লবীতেই খুন হয়েছে ১৫ জন। এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে ফোর স্টার গ্রুপের নাম আসছে তদন্তে। সূত্র মতে, ফোর স্টার গ্রুপের মামুনের নিয়ন্ত্রণে মিরপুর ১২, পল্লবী, বাউনিয়া ও সাগুফতা, ইব্রাহিমের নিয়ন্ত্রণে মিরপুর ১৩, ১৪, ভাসানটেক ও কালশী, শাহাদাতের নিয়ন্ত্রণে মিরপুর ১, ২, ৬ ও ৭, সর্বশেষ মুক্তারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মিরপর ১০ ও ১১। এসব এলাকার চাঁদাবাজি, মাদক কারবার থেকে শুরু করে হেন কোনো অপকর্ম নেই যা তারা করছে না।
যদিও এসব নিয়ে ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চায় না। জানা গেছে, মামুন বাহিনীর হয়ে দেশের মাটিতে তার অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে তারই বড় ভাই জামিল, ছোট ভাই মশিউর, রফিকুল, শহিদুল, নাটা আলমগীর, কালা মোতালেব, দেলোয়ার হোসেন রুবেল, রাজন, সানি, ভাগ্নে মামুন, সোহেল, কায়েস।
কিলার ইব্রাহিমের হয়ে কাজ করছে যুবরাজ, সাবু, শাকিল, ভাগ্নে সোহেল, কালা ইব্রাহিম, জনি। শাহাদাতের হয়ে টিপু সুমন, ফিটিং শিশির, বিহারি নিলা, প্রচার সাইফুল, পিচ্চি আলামিন, শামিম। মুক্তারের হয়ে তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে হাড্ডি সোহাগ, নওশাদ, আশিক, ডাসা শরিফ, এলেক্স জুয়েল, শুটার জাকির, তপু, আমিন, রকি, ছোট রাকিব, শাহাপরান, মিঠু, আতিকসহ আরও অনেকে।
সূত্র মতে, তালিকাভুক্ত পলাতক অপরাধী রবিন রাজধানীর বাড্ডায় চাঁদাবাজদের একটি চক্র নিয়ন্ত্রণ করেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মেহেদী নামে অপর এক সন্ত্রাসীও সক্রিয় রয়েছে। তার ক্যাডারাই গুলশান থানা বিএনপি নেতা সাধনকে খুন করে। এই মেহেদীর ছদ্মনাম কলিন্স। তার ক্যাডাররা স্থানীয় ব্যবসা ও নির্মাণ সাইট থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ওঠায়।
পুলিশ জানায়, মেহেদী ও রবিন ভাটারাতেও গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করে। বিদেশ থেকে স্থানীয় গ্যাং নিয়ন্ত্রণকারী তালিকাভুক্ত অন্য অপরাধীরা হলেন জিসান আহমেদ, ডালিম মাহবুব ও চঞ্চল। এই চক্রের কিছু সদস্য আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ের নেতা। সম্প্রতি কারওয়ান বাজার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক নেতা মোছাব্বির খুনে নাম আসে বিদেশে পলাতক দীলিপ ওরফে দাদা দীলিপের। এর আগে তার নাম শোনা না গেলেও বিদেশে পলাতক অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের হয়ে তিনি কারওয়ান বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে।
কারাগারে বসেই মগবাজারের কিছু এলাকা এখনও নিয়ন্ত্রণ করছে সুব্রত বাইন, তার মেয়ে খাদিজা ও সুব্রত বাইনের সেকেন্ড ইন কমান্ড মোল্লা মাসুদ। তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের ক্যাডাররা। যদিও মালিবাগ, রামপুরা, খিলগাঁও, পল্টন ও মতিঝিল এলাকায় একক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে জিসানের। নতুন করে মগবাজারের নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছেন সুব্রত বাইন ও জিসান। এ নিয়ে মগবাজারের মধুবাগে খুনের ঘটনাও ঘটেছে। সেই মামলায় বাইনের মেয়ে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।
এম.কে

