23.3 C
London
July 4, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

নারী শিক্ষায় বড় ধাক্কাঃ আফ্রিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মেয়েদের জন্য যুক্তরাজ্যের শিক্ষা প্রকল্প বাতিল

আফ্রিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ১০ লাখ মেয়েকে উচ্চশিক্ষার সুযোগের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে চালু হওয়া যুক্তরাজ্য সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কর্মসূচি মাত্র দুই বছরের মাথায় বাতিল করা হয়েছে। বৈদেশিক সহায়তা বাজেট কমানোর সিদ্ধান্তের পর এ উদ্যোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে।

প্রায় চার কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড ব্যয়ের এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল উন্নয়নশীল দেশের মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো এবং তাদের শিক্ষা অব্যাহত রাখতে সহায়তা করা। তবে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়নবিষয়ক দপ্তর জানিয়েছে, প্রকল্পটির দরপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং এটি আর বাস্তবায়ন করা হবে না।

এর আগে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, নারী ও মেয়েদের নিরাপত্তা, অধিকার ও ক্ষমতায়ন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। কিন্তু সেই ঘোষণার অল্প সময়ের মধ্যেই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কর্মসূচি বাতিল হওয়ায় সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী শিক্ষা বিষয়ে কাজ করা সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান ও ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য এ সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, নারী ও মেয়েদের ক্ষমতায়নের জন্য নেওয়া একটি প্রধান কর্মসূচি সহায়তা বাজেট কমানোর কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। তিনি বলেন, এ ধরনের শিক্ষা উদ্যোগ শুধু শিক্ষার্থীদের জীবনই বদলায় না, বরং আন্তর্জাতিক শিক্ষাগত সহযোগিতাকেও শক্তিশালী করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চশিক্ষা লাভ করা মেয়েদের বাল্যবিবাহের ঝুঁকি কয়েক গুণ কমে যায়। একই সঙ্গে তারা পারিবারিক সহিংসতার শিকার হওয়ার সম্ভাবনাও কম থাকে এবং ভবিষ্যতে তাদের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও শিক্ষা খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই কর্মসূচি বাতিলের সিদ্ধান্ত নারী ও মেয়েদের উন্নয়নে যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

এরই মধ্যে আফগানিস্তান, সুদান, মিয়ানমার ও ক্যামেরুনের নতুন শিক্ষার্থী ভিসা আবেদনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করায় ওই দেশগুলোর বহু নারী বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক শিক্ষা নিয়ে কাজ করা একটি সংসদীয় নেটওয়ার্কের সহপ্রতিষ্ঠাতা বলেন, সরকার একদিকে নারী ও মেয়েদের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে তাদের জীবন বদলে দিতে পারে এমন সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম—উচ্চশিক্ষার সুযোগ—ক্রমাগত সংকুচিত করছে।

চলতি বছরের শুরুতে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ দক্ষিণ সুদানে মেয়েশিশু ও প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার জন্য পরিকল্পিত প্রায় ১৫ কোটি পাউন্ডের আরেকটি শিক্ষা কর্মসূচিও বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া গণতান্ত্রিক কঙ্গো, ইথিওপিয়া, সিয়েরা লিওন, নাইজেরিয়া ও জিম্বাবুয়েতেও শিক্ষা সহায়তা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। নারী শিক্ষাবিষয়ক দপ্তরের বাজেটও অর্ধেকের বেশি কমানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর একটি জোটের মুখপাত্র বলেন, নারী ও মেয়েদের শিক্ষা ও সুরক্ষায় বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হলে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ এবং নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অর্জন হুমকির মুখে পড়বে।

জাতিসংঘের শিশু তহবিলের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী শিক্ষাখাতে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রায় ৩২০ কোটি মার্কিন ডলার কমে যেতে পারে, যা মোট সহায়তার প্রায় ২৪ শতাংশ। এর ফলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ অতিরিক্ত ৬০ লাখ শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। এদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানবিক সংকটপূর্ণ অঞ্চলের শিশু।

গত বছর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, ২০২৭ সাল থেকে দেশের বৈদেশিক সহায়তা বাজেট মোট জাতীয় আয়ের শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। এই সিদ্ধান্ত ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী অঙ্গীকারের বিপরীত হওয়ায় তৎকালীন আন্তর্জাতিক উন্নয়নমন্ত্রী পদত্যাগ করেন।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির জন্যই সহায়তা বাজেট কমানো হয়েছে। সরকারের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের প্রথম দায়িত্ব। একই সঙ্গে নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে বরাদ্দ অর্থ চলতি বছরে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈদেশিক সহায়তা কমানোর ফলে শুধু শিক্ষা নয়, বিশ্বের দরিদ্র ও সংকটাপন্ন দেশগুলোর নারী ও মেয়েদের ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়াতে সম্মত

ব্রিটেনের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বন্ধ হতে শুরু করেছে

যুক্তরাজ্যে ইমিগ্রেশন নিয়মে ভিসা কাগজ নেই, শুধু অনলাইন—বিপাকে অভিবাসীরা