TV3 BANGLA
মুক্তমতযুক্তরাজ্য (UK)

পাঁচ বছর থেকে দশ বছরের ILR ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এ কার্যকর করার ইংগিত যুক্তরাজ্যের হোম সেক্রেটারি শাবানা মাহমুদের

নাশীত রহমান || লন্ডন || ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের হোম অ্যাফেয়ার্স কমিটির সামনে মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সাক্ষ্য দিতে গিয়ে যুক্তরাজ্যের হোম সেক্রেটারি শাবানা মাহমুদ জানিয়েছেন যে সরকারের প্রস্তাবিত ‘earned settlement’ নীতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত খুব শিগগিরই নেওয়া হবে এবং এই বছরের মধ্যেই নতুন নীতিটি প্রকাশ করা হবে। এই নীতির অধীনে যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা বা ILR পাওয়ার সাধারণ সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে দশ বছর করা হবে। পাশাপাশি একটি নতুন কাঠামো চালু করা হবে যেখানে অভিবাসীদের যুক্তরাজ্যে তাদের অবদান, আচরণ এবং নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণের মাধ্যমে স্থায়ী বসবাস “অর্জন” করতে হবে।

মাহমুদকে প্রশ্ন করা হয় যে এই নীতি কি আগামী বছরের আগেই কার্যকর হবে, কারণ ২০২২ সালে যারা যুক্তরাজ্যে এসেছেন তারা বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ILR-এর জন্য যোগ্য হয়ে যাবেন। তিনি বলেন যে earned settlement কোনো নির্দিষ্ট একটি গ্রুপের জন্য নয়; এটি স্থায়ী বসবাসের পুরো ধারণাকে নতুনভাবে সাজানোর একটি মডেল। তার মতে, ILR মূলত স্থায়ী বসবাসের সমতুল্য এবং দৈনন্দিন জীবনে ILRধারী ও ব্রিটিশ নাগরিকের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। তাই যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের ভিত্তি পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বর্তমানে এটি প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সময়ের ভিত্তিতে দেওয়া হয়, যা সরকারের মতে পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

হোম সেক্রেটারি শাবানা মাহমুদকে অনেকেই যুক্তরাজ্যের বিতর্কিত ‘earned settlement’ নীতির মূল উদ্যোক্তা হিসেবে দেখছেন। তার রাজনৈতিক অবস্থানকে অনেক বিশ্লেষক কঠোর বা হকিশ ধারা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যা পূর্ববর্তী কনজারভেটিভ হোম সেক্রেটারি প্রীতি প্যাটেল এবং সুয়েলা ব্রেভারম্যানের নীতির সঙ্গে তুলনা করা হয়। যদিও তিনি লেবার পার্টির একজন সিনিয়র মন্ত্রী, তবুও তার অভিবাসন নীতির কঠোরতা লেবার পার্টির ভেতরেই বিতর্ক সৃষ্টি করেছে এবং পার্লামেন্টারি লেবার পার্টির একটি অংশ তার অবস্থানের সঙ্গে একমত নয়।

হোম সেক্রেটারি শাবানা মাহমুদের নীতির অন্যতম বিতর্কিত দিক হলো যুক্তরাজ্যে আগত অভিবাসীদের একটি অংশকে তিনি “বরিস ওয়েব” (বরিস জনসন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন হাজার হাজার অদক্ষ অযোগ্য অভিবাসিদের যুক্তরাজ্যে আগমনের বিদ্রুপপূর্ণ নাম – বরিস ওয়েব) হিসেবে দেখেন বলে সমালোচকদের দাবি। এই ধারণা থেকেই তিনি স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা অর্জনের নিয়মকে কঠোর করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। earned settlement নীতির মূল কাঠামো হলো ILR পাওয়ার সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে দশ বছর করা এবং অভিবাসীদের অবদান, আচরণ ও নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণের মাধ্যমে স্থায়ী বসবাস অর্জন করতে বাধ্য করা।

এই নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা হলো ফেব্রুয়ারি ২০২৭। কারণ ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যে আগত অভিবাসীরা বর্তমান নিয়মে (পাঁচ বছর বছরের ILR পাবার নিয়ম) ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এ  ILR-এর জন্য যোগ্য হয়ে যাবেন। মূলত কেয়ার ওয়ার্কার ও ছাত্র ভিসায় আগত   অভিবাসী ও তাদের পরিবারবর্গ এই  পরিকল্পনার টারেগেট। শাবানা মাহমুদের মূল পরিকল্পনা ছিল নীতিটি সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ কার্যকর করা। কিন্তু লেবার পার্টির নেতৃত্বে পরিবর্তন – কিয়ার স্টারমার থেকে অ্যান্ডি বার্নহামের কাছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হস্তান্তর শাবানা মাহমুদের মূল কঠোর এই নীতির বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটায়। তবে হোম সেক্রেটারি শাবানা মাহমুদ দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়েছেন যে earned settlement নীতিকে তিনি আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবেন এবং এটি যুক্তরাজ্যের অন্যতম বিতর্কিত অভিবাসন আইন হিসেবে জায়গা করে নেবে।

এই নীতি পার্লামেন্টে ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। লেবার পার্টির অনেক এমপি, লিবারেল ডেমোক্র্যাট এমপি এবং স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (SNP) সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও সংখ্যালঘু দল এই নীতির বিরোধিতা করবে। তারা মনে করেন যে নীতিটি অভিবাসীদের প্রতি অযথা কঠোর এবং যুক্তরাজ্যের বহুসাংস্কৃতিক সমাজের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে কনজারভেটিভ পার্টির এমপি এবং রিফর্ম ইউকে পার্টির এমপিরা এই নীতিকে সমর্থন করতে পারে, কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অভিবাসন নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।

এই পরিস্থিতিতে earned settlement নীতি যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ব্যবস্থায় একটি বড় রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। নীতিটি কার্যকর হলে হাজার হাজার অভিবাসীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, কর্মসংস্থান, পরিবার স্থাপন এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা—সবকিছুতেই বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। আর যদি নীতি কার্যকর হওয়ার আগে পার্লামেন্টে বাধার মুখে পড়ে, তবে এটি লেবার সরকারের অভিবাসন নীতি নিয়ে আরও বড় রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাজ্যের হোম সেক্রেটারি শাবানা মাহমুদ স্বীকার করেন যে ২০২২ সালে আগত একটি বড় গ্রুপ রয়েছে যারা নিয়ম পরিবর্তন না হলে ২০২৭ সালে যোগ্য হয়ে যাবে। তিনি বলেন যে অভিবাসন ব্যবস্থায় নিশ্চয়তা দেওয়া জরুরি এবং যুক্তরাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করার সময় যে নিয়ম কার্যকর থাকে সেটিই প্রযোজ্য হয়, আগমনের সময়কার নিয়ম নয়। এই নীতি ভবিষ্যতেও একইভাবে কার্যকর থাকবে। তিনি আরও জানান যে এই বছরের মধ্যেই নতুন নীতি প্রকাশ করা হবে এবং এতে পরামর্শ প্রক্রিয়ার সব মতামত ও সম্ভাব্য ট্রানজিশনাল ব্যবস্থাগুলো বিবেচনা করা হবে।

কবে নীতি ঘোষণা করা হবে—এ প্রশ্নে শাবানা মাহমুদ নির্দিষ্ট তারিখ দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন যে সরকার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পরামর্শ পেয়েছে এবং সেগুলো বিশ্লেষণ করতে সময় লেগেছে। পাশাপাশি নীতির ভিত্তিতে যে মডেলিং করা হচ্ছে সেটিও সময়সাপেক্ষ।

লেবার এমপি বেল রিবেইরো-অ্যাডি জানতে চান যে নীতি কার্যকর হলে মানুষকে কীভাবে পরিবর্তন সম্পর্কে অবহিত করা হবে। মাহমুদ বলেন যে এই নীতির আওতায় আসা ব্যক্তিরা অত্যন্ত সচেতন এবং তারা সাধারণত নিয়মকানুন খুব ভালোভাবে জানেন। তিনি বলেন যে ট্রানজিশনাল ব্যবস্থাগুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত এই বছরের মধ্যেই হবে এবং ২০২২ সালে আগতদের প্রথম যোগ্যতার সময়ের অনেক আগেই তা জানিয়ে দেওয়া হবে।

রিবেইরো-অ্যাডি আবারও উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরেন এবং বলেন যে নীতির সম্ভাব্য রেট্রোস্পেকটিভ প্রভাব অভিবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। শাবানা মাহমুদ জানান যে ট্রানজিশনাল প্রোটেকশন নিয়ে সরকার বিশেষভাবে পরামর্শ নিয়েছে এবং বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছে। কিছু গ্রুপকে আগের নিয়মে পাঁচ বছরেই ILR দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, আবার অন্য গ্রুপের জন্য ধাপে ধাপে সময়সীমা বাড়ানোর মতো বিকল্পও রয়েছে। তিনি বলেন যে সিদ্ধান্ত হলে তা সংসদে উপস্থাপন করা হবে এবং জনসমক্ষে বিস্তৃত আলোচনা হবে।

পরবর্তীতে লেবার এমপি লুইস অ্যাটকিনসন বিষয়টি আবারও উত্থাপন করেন। তিনি বলেন যে অভিবাসীরা নিয়ম সম্পর্কে সচেতন হলেও তারা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। তিনি একটি পরিবারের কথা উল্লেখ করেন যারা পাঁচ বছর পূর্ণ করার পরও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন এবং জানেন না যে তাদের আবার নতুন চাকরি বা নতুন ভিসা খুঁজতে হবে কি না। তিনি প্রশ্ন করেন যে এই অনিশ্চয়তা কি সরকারের কাঙ্ক্ষিত অভিবাসী একীকরণকে বাধাগ্রস্ত করছে।

যুক্তরাজ্যের হোম সেক্রেটারি শাবানা মাহমুদ এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন যে সরকারকে অভিবাসীদের স্বার্থ এবং যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়। তিনি স্বীকার করেন যে অনেক মানুষ জানতে চাইছেন তাদের ক্ষেত্রে কোন নিয়ম প্রযোজ্য হবে। তিনি বলেন যে সরকার পরামর্শগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করছে এবং ট্রানজিশনাল ব্যবস্থার সম্ভাব্য প্রভাবগুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

শাবানা মাহমুদ বলেন যে সরকার একটি সঠিক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দায়িত্বশীল নীতি তৈরি করতে চায়—যেখানে যুক্তরাজ্যে কাজ করতে আসা মানুষদের প্রতি দায়িত্ব, পূর্ববর্তী সরকারের ব্যর্থতা সংশোধন এবং যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের স্বার্থ—সবকিছু বিবেচনায় রাখা হবে।

হোম সেক্রেটারি শাবানা মাহমুদের নেতৃত্বে যুক্তরাজ্যের earned settlement নীতি এখন দেশের অভিবাসন রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি। নীতিটি মূলত স্থায়ী বসবাসের পথকে কঠোর করা এবং অভিবাসীদের ওপর নতুন মানদণ্ড আরোপ করার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের অভিবাসন কাঠামোকে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা। লেবার পার্টির ভেতরে মতপার্থক্য, নেতৃত্ব পরিবর্তনের কারণে নীতি ঘোষণায় বিলম্ব এবং পার্লামেন্টে সম্ভাব্য বিরোধিতা—সবকিছু মিলিয়ে এই নীতি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। তবুও শাবানা মাহমুদ দৃঢ়ভাবে নীতিটি বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং তিনি চান এটি যুক্তরাজ্যের অভিবাসন আইনের একটি স্থায়ী ও প্রভাবশালী অধ্যায় হয়ে উঠুক। ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর সময়সীমা এই নীতির কেন্দ্রবিন্দু, কারণ ওই সময়েই প্রথম বড় অভিবাসী গ্রুপ ILR-এর জন্য যোগ্য হবে। নীতি কার্যকর হলে অভিবাসীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, নিরাপত্তা এবং স্থায়ী বসবাসের পথ নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হবে। আর যদি নীতি পার্লামেন্টে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে, তবে এটি লেবার সরকারের অভিবাসন নীতি নিয়ে আরও গভীর রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করবে। শেষ পর্যন্ত earned settlement নীতি যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ব্যবস্থায় একটি নতুন দিক নির্দেশ করবে—তা কঠোরতার দিকে হোক বা রাজনৈতিক সমঝোতার দিকে—এটি এখন দেশের অভিবাসন ভবিষ্যতের অন্যতম নির্ধারক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরো পড়ুন

ফিলিস্তিনের সমর্থনে বিক্ষোভ করায় এনএইচএস কর্মীদের কর্মস্থলে নিষিদ্ধ ঘোষণা

যুক্তরাজ্যের আশ্রয় ব্যবস্থা ‘সেকেলে’, বড় পরিবর্তন আনার ঘোষণা

হংকংয়ের জন্য বিশেষ ভিসা চালু করলো যুক্তরাজ্য

নিউজ ডেস্ক