রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে রাশিয়ার কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। জার্মানির লেইপজিগ বিমানবন্দরে বিস্ফোরকভর্তি ড্রোন পাওয়ার ঘটনায় মস্কোকে দায়ী করার পর বার্লিন রাশিয়ার একটি কনস্যুলেট ও একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই ঘটনায় লন্ডন রাশিয়ার চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
গত ৪ আগস্ট জার্মানির লেইপজিগ বিমানবন্দরে একটি ইউক্রেনীয় বিমানের কাছে বিস্ফোরকভর্তি একটি ড্রোন শনাক্ত করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিমানবন্দরের রানওয়ে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং পরে ড্রোনটি নিষ্ক্রিয় করা হয়।
জার্মান সরকারের দাবি, গোয়েন্দা তথ্য ও তদন্তের ভিত্তিতে ঘটনাটির পেছনে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বার্লিনের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ইউরোপজুড়ে রাশিয়ার পরিচালিত বৃহত্তর ‘হাইব্রিড অপারেশন’-এর অংশ হতে পারে।
তদন্তে রাশিয়ায় জন্মগ্রহণকারী এক লাতভীয় নাগরিক এবং এক বেলারুশীয় নাগরিকের নামও সামনে এসেছে। তাদের একজনকে লজিস্টিকস সমন্বয়ের সঙ্গে এবং অন্যজনকে প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ঘটনার পর জার্মান সরকার রাশিয়ার একটি কনস্যুলেট বন্ধ করার পাশাপাশি বার্লিনে থাকা রাশিয়ার একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। বার্লিনের এই সিদ্ধান্ত মস্কোর সঙ্গে বিদ্যমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
জার্মানির পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের জার্মানিকে ইউরোপের প্রধান সামরিক শক্তিতে পরিণত করার বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে লাভরভ অভিযোগ করেন, মের্জের নীতিগুলো কার্যত রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার দিকেই এগোচ্ছে।
লাভরভের ভাষায়, লেইপজিগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে জার্মানির নেওয়া পদক্ষেপকে ‘মোটামুটিভাবে প্রকৃত যুদ্ধের শুরু’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জার্মানির নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা পদক্ষেপকে ‘আরেকটি ভুল’ বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে রাশিয়ার বার্লিন দূতাবাস লেইপজিগ বিমানবন্দর ঘটনার সঙ্গে মস্কোর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এদিকে একই ঘটনার জেরে যুক্তরাজ্যও কূটনৈতিকভাবে সরব হয়েছে। লন্ডন রাশিয়ার চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে লেইপজিগের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এর পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারা কিয়েভে অবস্থান করছেন বলে রয়টার্সের একটি সূত্র জানিয়েছে। ইউক্রেনের সঙ্গে পশ্চিমা মিত্রদের নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে কিয়েভের আলোচনায় ইউরোপীয় সমর্থন অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এই সফর হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে স্পষ্ট হচ্ছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে ইউরোপের প্রধান দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র ও সামরিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অবকাঠামো, বিমানবন্দর, সাইবার নিরাপত্তা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সম্ভাব্য রুশ ‘হাইব্রিড হুমকি’ মোকাবিলাতেও ইউরোপীয় দেশগুলো সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
লেইপজিগ বিমানবন্দরকে ঘিরে অভিযোগ, জার্মানির পাল্টা ব্যবস্থা, যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক প্রতিবাদ এবং কিয়েভে তিন ইউরোপীয় দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও জার্মানি ও যুক্তরাজ্য এখনো রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ায়নি, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা পর্যায়ে তাদের অবস্থান ক্রমেই কঠোর হচ্ছে।
সূত্রঃ স্কাই নিউজ
এম.কে

