TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ফ্রান্স-যুক্তরাজ্যের যৌথ নজরদারিও ঠেকাতে পারছে না পাচারকারীদেরঃ ভয়ংকর নতুন কৌশল

যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের যৌথ তৎপরতা সত্ত্বেও ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে অভিবাসীদের যুক্তরাজ্যে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা থামছে না। বরং ফরাসি উপকূলে নজরদারি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানবপাচারকারী চক্রগুলো তাদের কৌশল ও নৌযাত্রার রুট পরিবর্তন করছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ক্যালেই ও ডানকার্ক এলাকায় চাপ বাড়ায় এখন আরও পশ্চিমের উপকূল থেকে নৌকা ছাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

সাবেক বর্ডার ফোর্স প্রধান টনি স্মিথ সতর্ক করেছেন, ফ্রান্সের প্রায় ৩০০ মাইল দীর্ঘ উপকূলজুড়ে পাচারকারীদের প্রতিটি সম্ভাব্য উৎক্ষেপণস্থল বন্ধ করা অত্যন্ত কঠিন। তার মতে, ক্যালেই ও ডানকার্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়লে পাচারকারীরা অন্য জায়গা খুঁজে নেবে—এমন পরিস্থিতি এখন বাস্তবেই দেখা যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় প্রায় ১৪০ জন অভিবাসীকে বহনকারী একটি বড় ডিঙি নৌকা ফ্রান্সের নরম্যান্ডি এলাকার দিক থেকে যাত্রা করে ইংল্যান্ডের পোর্টসমাউথ উপকূলে পৌঁছায়। নৌকাটি প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে নজরদারিতে ছিল। শেষ পর্যন্ত দুটি লাইফবোটের সহায়তায় অভিবাসীদের উপকূলে আনা হয়।

ঘটনাটি বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে, কারণ এটি প্রচলিত ক্যালেই-ডোভার রুটের বাইরে মানবপাচারকারীদের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থাৎ, ফ্রান্সের একটি নির্দিষ্ট উপকূলীয় এলাকায় অভিযান জোরদার করলেই পাচারকারীদের থামানো যাচ্ছে না; তারা নতুন উৎক্ষেপণস্থল বেছে নিয়ে আবারও চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছে।

শুধু রুট পরিবর্তন নয়, পাচারকারীরা বড় আকারের ‘মেগা-ডিঙি’ ব্যবহার করছে বলেও উদ্বেগ বাড়ছে। এসব নৌকায় একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ তোলা হচ্ছে। এর আগে ২৩০ জনকে বহনকারী একটি নৌকাও চ্যানেলে শনাক্ত হয়েছিল। আবার ১৭৩ জনকে বহনকারী একটি নৌকা বুলোন উপকূলের কাছে ডুবে যায়।

এ ধরনের ঘটনা মানবপাচারকারীদের ব্যবসার ভয়াবহ ঝুঁকিও সামনে আনছে। ছোট ও অনিরাপদ নৌকায় দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার কারণে যেকোনো সময় নৌকা ডুবে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে। কিছু অভিবাসীকে ভাসমান ডিঙ্গিতে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সমুদ্রে থাকতে হচ্ছে বলেও তথ্য উঠে এসেছে।

ফ্রান্স পরিস্থিতি মোকাবিলায় অতিরিক্ত পুলিশ কর্মকর্তা মোতায়েন করেছে। ল্য তুকে, বের্ক, ল্য ত্রেপোর ও দিয়েপসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে ৪৫ কর্মকর্তা পাঠানো হয়েছে। এর বাইরে উত্তরাঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ৫০ জন কর্মকর্তা ইতোমধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন।

তবে বিশাল উপকূলরেখা এবং পাচারকারীদের পরিবর্তিত কৌশলের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য প্রতিটি সম্ভাব্য উৎক্ষেপণস্থল পাহারা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। একটি জায়গায় অভিযান বাড়লে অন্য জায়গা দিয়ে নৌকা পাঠানোর সুযোগ পাচারকারীরা কাজে লাগাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে পোর্টসমাউথে অভিবাসী নৌকা পৌঁছানোর পর স্থানীয় পরিস্থিতিও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শত শত বিক্ষোভকারী রাস্তায় অবস্থান নিয়ে অভিবাসীদের বহনকারী বাসকে প্রসেসিং সেন্টারে যেতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।

ব্রিটিশ রাজনীতিতেও বিষয়টি নিয়ে চাপ বাড়ছে। কনজারভেটিভ এমপি অ্যালান ম্যাক দাবি করেছেন, ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে আসা অভিবাসীদের নির্বাসনের ব্যবস্থা করা উচিত এবং রুয়ান্ডা-ধাঁচের পরিকল্পনা পুনরায় চালু করা প্রয়োজন। রিফর্ম ইউকের নেতারাও কঠোর অভিবাসন নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

শ্যাডো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ক্রিস ফিলপও চলতি বছরে প্রায় ২০ হাজার ‘অবৈধ অভিবাসী’ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে এসেছে বলে দাবি করেছেন। তিনি ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশন বা ইএইচআরসি থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষেও মত দিয়েছেন। তবে এসব রাজনৈতিক বক্তব্য সংশ্লিষ্ট রাজনীতিবিদদের দাবি হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।

অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকার বলছে, ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথভাবে নেওয়া পদক্ষেপ ইতোমধ্যে কার্যকর ফল দিচ্ছে। সরকারের দাবি, চলতি বছরে ছোট নৌকায় চ্যানেল পারাপারের সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে এবং যৌথ অভিযানে বিপুলসংখ্যক পারাপারের চেষ্টা ঠেকানো হয়েছে।

তবু নতুন রুটের আবির্ভাব পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। কারণ একটি দেশের সীমান্ত বা একটি নির্দিষ্ট উপকূলীয় এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিবর্তে এখন ফ্রান্সের বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে পাচারকারীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

সাবেক বর্ডার ফোর্স প্রধান টনি স্মিথের ভাষায়, মানবপাচার এখন আন্তর্জাতিক সংগঠিত অপরাধে পরিণত হয়েছে এবং এই ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক। ফলে পাচারকারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাপের মুখে থেমে যাওয়ার পরিবর্তে নতুন রুট, নতুন নৌকা ও নতুন কৌশল ব্যবহার করতে পারে।

ক্যালেই ও ডানকার্কে কড়াকড়ির পর নরম্যান্ডি ও আরও পশ্চিমের উপকূল ব্যবহার শুরু হওয়ার ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, মানবপাচারকারীরা পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত নিজেদের কৌশল বদলাতে সক্ষম। আর এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ছোট নৌকার সংকট শুধু ডোভার বা কেন্টের সমস্যা না থেকে পুরো দক্ষিণ ইংল্যান্ডের উপকূলীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্রঃ স্কাই নিউজ

এম.কে

আরো পড়ুন

ইইউর অভিবাসন চুক্তিতে ফের যোগ দেওয়ার চাপঃ ব্রেক্সিটের খেসারত দিচ্ছে যুক্তরাজ্য

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইলি হামলায় যোগ দেবে না যুক্তরাজ্যঃ স্টারমার

যুক্তরাজ্যে অবৈধ বন উজাড় ঠেকাতে কঠোর আইনঃ কফি-চকলেটসহ নিত্যপণ্যে আসছে নতুন নজরদারি