ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে চলমান বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিয়েছে। রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এতে সরকারি ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে, ফ্রান্সের অভিবাসন নীতির সমালোচনা করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স।
রোববার (১৮ অক্টোবর) ফ্রান্সের বিভিন্ন সড়কে সহিংসতার চিহ্ন দেখা যায়। এর আগে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় শনিবার প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে।
ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ট্রাম্প ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘চলুন ফ্রান্সে যাই? চমৎকার জায়গা। কোনো দাঙ্গা নেই, কোনো বিপ্লব নেই। জানেন তো, ফ্রান্স যেন বিপ্লবের জন্য দারুণ উপযুক্ত জায়গা। অবিশ্বাস্য! চলুন ফ্রান্সে গিয়ে বিপ্লবে যোগ দিই।’
এদিকে, সহিংসতার জন্য ফ্রান্সসহ পশ্চিমা দেশগুলোর অভিবাসন নীতিকে দায়ী করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। তার দাবি, পশ্চিমা দেশগুলো অভিবাসীদের সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা এবং সামাজিক সংহতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ভ্যান্স বলেন, বৈচিত্র্য ও সহানুভূতির নামে পশ্চিমা উদারপন্থীরা তৃতীয় বিশ্বের মানুষকে ফ্রান্সসহ অন্যান্য দেশে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু অভিবাসীদের আত্মীকরণ এবং সামাজিক সংহতির মৌলিক প্রশ্নগুলো উপেক্ষা করেছেন তারা।
ভ্যান্স আরও দাবি করেন, এ ধরনের পরিস্থিতির পরিণতি সম্পর্কে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু সেই সতর্কতা উপেক্ষা করা হয়েছে। ফ্রান্সের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই চলমান সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানান তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদেরও বিষয়টি থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে ভ্যান্স অভিযোগ করেন, মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটরা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এমন ভবিষ্যৎ চান।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। তবে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক সংগঠন সিজিটি দাবি করেছে, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল ৮ লাখ।
বিক্ষোভ চলাকালে একদল আন্দোলনকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও আতশবাজি নিক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের পাশাপাশি গাড়িতে আগুন দেওয়া এবং দোকানপাটে লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
প্যারিসের মেয়র ইমানুয়েল গ্রেগোইরে জানিয়েছেন, রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের অংশবিশেষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মুখোশধারী তরুণদের কয়েকটি দল রাস্তায় থাকা গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং দোকানপাটে লুটপাট চালায়।
সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে লিমোজ শহরে। সেখানে ১৪০ বছরের বেশি পুরোনো একটি টাউন হলে জোর করে প্রবেশ করে আগুন ধরিয়ে দেন মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা। স্থানীয় প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগুনে ভবনটি প্রায় সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে।
এ ছাড়া মার্সেই ও লিলে দুটি টাউন হলে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। বোর্দো শহরের একটি পুলিশ ফাঁড়ি এবং লিয়োঁর একটি পর্যটন কার্যালয়েও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
সহিংসতার ঘটনায় কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তিনি বলেছেন, সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া হবে। সরকারি প্রশাসনিক কার্যালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও টাউন হলে হামলাকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর ছয় মাস বাকি থাকায় দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমন সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভ এবং তা থেকে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সূত্রঃ এএফপি
এমকে

