বঙ্গোপসাগরে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ জোরদার করেছে বাংলাদেশ। সমুদ্রের ২৬টি ব্লকে অনুসন্ধান ও সম্ভাব্য উৎপাদনের জন্য চালু করা আন্তর্জাতিক দরপত্রে চীনের সিনোপেক ও সিএনওওসি ইন্টারন্যাশনাল এবং তুরস্কের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি টিপিএও দরপত্রের নথি সংগ্রহ করেছে। একই সঙ্গে এক্সনমোবিল, বিপি, শেল, ইনি ও পেট্রোব্রাসের মতো আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোকেও আগ্রহী করার চেষ্টা চলছে। এই উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় জ্বালানি অনুসন্ধানের লক্ষ্যে ২০২৬ সালের ২৪ মে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর আওতায় ২৬টি ব্লকের মধ্যে ১১টি অগভীর সমুদ্রে এবং ১৫টি গভীর সমুদ্রে অবস্থিত। বিদেশি কোম্পানিগুলোকে এসব এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং সম্ভাব্য উৎপাদনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল ৩০ নভেম্বর ২০২৬। তবে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর অনুরোধের পর সময়সীমা চার মাস বাড়িয়ে ৩১ মার্চ ২০২৭ নির্ধারণ করেছে সরকার। পাশাপাশি দরপত্রে অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি আরও সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগের কয়েকটি দরপত্রে প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় এবার বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে অনুসন্ধান ও উৎপাদন অংশীদারত্বের শর্তগুলো আরও প্রতিযোগিতামূলক করার চেষ্টা চলছে।
পেট্রোবাংলার তথ্যের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সিনোপেক ও সিএনওওসি ইন্টারন্যাশনাল এবং তুরস্কের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি টিপিএও দরপত্রের নথি সংগ্রহ করেছে। এসব নথির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য ব্লকগুলোর ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট তথ্য মূল্যায়নের সুযোগ পাচ্ছে। তবে নথি সংগ্রহ করাকে চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বা কোনো ব্লকে কাজ করার অনুমোদন হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। দরপত্র জমা, মূল্যায়ন এবং চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরই তাদের অংশগ্রহণের পরবর্তী ধাপ নিশ্চিত হবে।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধানে পশ্চিমা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিকেও যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিপি দরপত্রের নথির মূল্য পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং তথ্য চেয়েছিল। অন্যদিকে এক্সনমোবিল, শেল, ইনি ও পেট্রোব্রাসের মতো কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের আগ্রহ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এসব কোম্পানি শেষ পর্যন্ত দরপত্রে অংশ নেবে কি না এবং কোন ব্লক পাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে প্রাকৃতিক গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কমে গেলে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ওঠানামা করলে দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। বঙ্গোপসাগরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং সেখান থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হলে আমদানির প্রয়োজন কমানো, শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে সমুদ্রসীমার ওপর বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং সেখানে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য তেল-গ্যাসের মজুত পাওয়া এক বিষয় নয়। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে নিজের সামুদ্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু সেই এলাকায় পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে ভূতাত্ত্বিক জরিপ, অনুসন্ধান কূপ খনন, নমুনা বিশ্লেষণ এবং বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাই প্রয়োজন।
সমুদ্রের তলদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান একটি ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। অনুসন্ধানে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়, অথচ প্রতিটি ব্লকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক মজুত পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না। কোনো এলাকায় গ্যাসের ভূতাত্ত্বিক সম্ভাবনা থাকলেও সেখানে বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হবে, এমন সিদ্ধান্ত আগাম দেওয়া সম্ভব নয়। আবিষ্কারের পরও উত্তোলন অবকাঠামো নির্মাণ ও উৎপাদন শুরু করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। চীন, তুরস্ক ও অন্যান্য দেশের কোম্পানিগুলোর আগ্রহ কার্যকর চুক্তি ও অনুসন্ধান কার্যক্রমে রূপ নিলে দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় এই উদ্যোগের প্রকৃত অবদান নির্ভর করবে দরপত্রের ফলাফল, অনুসন্ধানের সাফল্য, বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক মজুত আবিষ্কার এবং উৎপাদন শুরু করার সক্ষমতার ওপর।
সূত্রঃ সিনোপেক\সিএনওওসি ইন্টারন্যাশনাল
এমকে

