বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা, টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি এবং পাঁচ শতাধিক শিশুমৃত্যুর ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে দেশটির চলমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ সংকট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া হামের প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত ৫১২ জনের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুধু গত ২৪ ঘণ্টাতেই মারা গেছে আরও ১৩ শিশু। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালগুলোতে হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিশেষ ওয়ার্ড খোলা হলেও পর্যাপ্ত আইসিইউ নেই। ফলে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একবার আক্রান্ত হলে এর নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপুষ্টিতে ভোগা এবং টিকা না নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগ প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ এবং শ্বাসতন্ত্রের জটিলতাসহ বিভিন্ন গুরুতর সমস্যা দেখা দিচ্ছে আক্রান্তদের মধ্যে।
ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ আইনুল ইসলাম খান আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপিকে বলেন,
“হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও জটিলতা না থাকলে সুস্থ একটি শিশু সামান্য ওষুধেই বেঁচে যেতে পারে। কিন্তু এখানে অধিকাংশ শিশুই শ্বাসকষ্ট এবং চোখ, গলা ও ফুসফুসে সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে।”
১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশ বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি চালু করেছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রধান রানা ফ্লাওয়ার জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, এই কার্যক্রমের পূর্ণ প্রভাব বুঝতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক আন্দোলন ও পরবর্তী অস্থিরতার সময় টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। ওই সময় বহু এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং বিপুল সংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। একই সঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারের সময়কার স্বাস্থ্যখাতের দুর্বল ব্যবস্থাপনাও বর্তমান সংকটকে আরও গভীর করেছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি দাবি করেছিল যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং কয়েকটি বেশি আক্রান্ত এলাকায় সংক্রমণ কমতে শুরু করেছে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ মৃত্যুর পরিসংখ্যান সেই দাবিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
এদিকে গ্লোবাল অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স পার্টনারশিপ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক নীতিপত্রে সতর্ক করে বলেছে, টিকাদানে ঘাটতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ ক্ষমতার সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের হামের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি শুধু দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাই প্রকাশ করেনি, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। আল জাজিরার মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ হওয়ায় বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও শিশু সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
সূত্রঃ আল জাজিরা
এম.কে

