TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

বাংলাদেশের সরকারী অফিসের ঘুষের রেট জানুন এবার এক ক্লিকেই

সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কোথায় কত টাকা ঘুষ দাবি করা হচ্ছে—সেই তথ্য সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে বাংলাদেশে চালু হয়েছে নতুন একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘ঘুষসাইট’। দুই তরুণ উদ্যোক্তার তৈরি এই ওয়েবসাইটে কোনো অ্যাকাউন্ট খোলা ছাড়াই সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষের দাবির অভিজ্ঞতা বেনামে জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

গত ২১ আগস্ট চালু হওয়া ঘুষসাইটে ব্যবহারকারীরা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, আনুমানিক অবস্থান, দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ এবং ঘুষ দেওয়ার পর কী ঘটেছে—এসব তথ্য জানাতে পারেন। নির্মাতাদের দাবি, নির্দিষ্ট কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা নয়; বরং সরকারি সেবায় অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের ধরন ও সম্ভাব্য দুর্নীতির একটি উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার তৈরি করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।

ঘুষসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২৩ আগস্ট পর্যন্ত দেশের আটটি বিভাগ থেকে মোট ৪৫৮টি প্রতিবেদন জমা পড়েছে। এসব প্রতিবেদনে ঘুষ হিসেবে দাবিকৃত অর্থের মোট পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রতিবেদন এসেছে ঢাকা বিভাগ থেকে—২৫৪টি। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৮টি, সিলেটে ২৪টি, রাজশাহী ও খুলনায় ২২টি করে, ময়মনসিংহে ১৬টি, রংপুরে ১৫টি এবং বরিশালে ৭টি প্রতিবেদন জমা হয়েছে।

তবে এই সংখ্যাগুলোকে সরকারি খাতে ঘুষের প্রকৃত পরিমাণ হিসেবে বিবেচনা না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন ঘুষসাইটের অন্যতম নির্মাতা সাইফ কবির। কারণ, সাইটে প্রকাশিত তথ্যগুলো ব্যবহারকারীদের নিজেদের দেওয়া এবং এখনো যাচাই করা হয়নি।

সাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনের গড় দাবিকৃত ঘুষের পরিমাণ প্রায় ৩৩ হাজার ৭৪৭ টাকা। তবে জমি, কাস্টমস ও করসংক্রান্ত কয়েকটি বড় অঙ্কের অভিযোগের কারণে গড় পরিমাণ বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন নির্মাতারা।

ঘুষসাইটের অন্যতম নির্মাতা সাইফ কবিরের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ঘুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণা থাকলেও কোথায় কত টাকা দাবি করা হচ্ছে, তার কোনো উন্মুক্ত ও নির্দিষ্ট হিসাব নেই।

তার যুক্তি, একজন মানুষ যখন কোনো সরকারি দপ্তরে জরুরি প্রয়োজনে যান, তখন কাউন্টারে তাকে কোনো একটি সেবার জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দাবি করা হতে পারে। কিন্তু সেই টাকা প্রচলিত হারের কাছাকাছি কি না, নাকি তার চেয়ে অনেক বেশি—তা জানার সুযোগ সাধারণত থাকে না।

এই তথ্যের ঘাটতি পূরণ করতেই উন্মুক্ত ‘লেজার’ তৈরির চিন্তা করা হয়েছে বলে জানান তিনি। পর্যাপ্ত সংখ্যক মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করলে ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট দপ্তরে সেবার জন্য কত টাকা দাবি করা হতে পারে, সে সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

ঘুষসাইটের পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত কয়েকটি ধাপে পরিচালিত হয়। প্রথমে ব্যবহারকারীকে সরকারি দপ্তর, সেবার ধরন, আনুমানিক অবস্থান, দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ এবং শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে—এসব তথ্য দিতে হয়।

তবে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর নাম, ফোন নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ফাইল নম্বর কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তিগত শনাক্তকারী তথ্য প্রকাশ না করার নির্দেশনা রয়েছে।

তথ্য জমা দেওয়ার পর সেটি প্রকাশের আগে একটি স্বয়ংক্রিয় মডারেশন বা তথ্য পরিমার্জন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যায়। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা প্রতিবেদনের মধ্যে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য, শনাক্তকারী তথ্য, আপত্তিকর ভাষা ও স্প্যাম বাদ দিতে কাজ করে।

তবে এই প্রযুক্তি কোনো অভিযোগ সত্য কি না, তা যাচাই করে না।

অর্থাৎ, ঘুষসাইটে প্রকাশিত কোনো অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। উদ্যোক্তারাও নিজেদের প্ল্যাটফর্মের তথ্যকে যাচাইকৃত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করছেন না।

ঘুষসাইটের নির্মাতারা এটিকে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানোর প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও দাবি করছেন না। তাদের বক্তব্য, এটি মূলত একটি ‘সচেতনতামূলক লেজার’, যেখানে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করা হবে।

সাইটের তথ্য বিভাগ, সরকারি দপ্তর, দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ ও ফলাফলের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করা যায়। ফলে ভবিষ্যতে কোনো একটি সরকারি সেবার ক্ষেত্রে একই ধরনের অভিযোগ বারবার জমা পড়লে সেখান থেকে একটি সম্ভাব্য প্রবণতা বা ‘প্যাটার্ন’ শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

উদ্যোক্তাদের মতে, একটি অভিযোগ বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে পারে। কিন্তু একই দপ্তর বা সেবার ক্ষেত্রে বহু মানুষ যদি কাছাকাছি অঙ্কের ঘুষ দাবি করার কথা জানান, তখন সেটি একটি ধারাবাহিক প্রবণতার ইঙ্গিত দিতে পারে।

ঘুষসাইটে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সরকারি সেবা নিয়ে অভিযোগ জমা পড়েছে। এর একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ—বিআরটিএতে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ১৫ হাজার টাকা দেওয়ার দাবি করা হয়েছে।

আরেকটি প্রতিবেদনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মহাখালী অঞ্চলে জন্মনিবন্ধনের জন্য ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের কোনোটিকেই চূড়ান্ত সত্য বা প্রমাণিত দুর্নীতির ঘটনা হিসেবে দেখছে না প্ল্যাটফর্মটির নির্মাতারা। তাদের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, এগুলো ব্যবহারকারীদের দেওয়া অযাচাইকৃত অভিযোগ।

সাইফ কবির জানান, ভারতের ‘bribes.fyi’ নামের একটি ওয়েবসাইট দেখে বাংলাদেশে একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার চিন্তা আসে। পরে তিনি বিষয়টি তার বন্ধু ও সহ-নির্মাতা সাহেদ শরীফকে জানান। এরপর দুজন মিলে মাত্র একদিনের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য ঘুষসাইটের প্রাথমিক সংস্করণ তৈরি করেন।

বর্তমানে প্ল্যাটফর্মটি নির্মাতাদের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি ইচ্ছুক ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে অনুদান নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে কোনো অভিযোগ বা প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যবহারকারীর কাছ থেকে কোনো ফি নেওয়া হয় না।

ঘুষসাইটের নির্মাতাদের প্রত্যাশা, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি মানুষ তাদের অভিজ্ঞতা বেনামে প্রকাশ করবেন। এতে দেশের সরকারি সেবাখাতে কোথায়, কোন ধরনের সেবায় এবং কী পরিমাণ অর্থ দাবি করা হচ্ছে—তার একটি বড় তথ্যভান্ডার তৈরি হতে পারে।

এই তথ্য ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষকে সরকারি দপ্তরে যাওয়ার আগে সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। একই সঙ্গে সাংবাদিক, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের জন্যও এটি প্রাথমিক তথ্যের উৎস হিসেবে কাজে আসতে পারে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ঘুষসাইটে থাকা তথ্যকে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কারণ, প্রতিটি প্রতিবেদন ব্যবহারকারীর নিজস্ব দাবি এবং তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

ঘুষসাইটে সরাসরি প্রবেশ করে প্রকাশিত প্রতিবেদন দেখা বা নিজের অভিজ্ঞতা বেনামে জানাতে পাঠকরা ওয়েবসাইটটি ব্যবহার করতে পারেন:

ঘুষসাইটে প্রবেশ করুন — www.ghush.site

প্রতিবেদনটির মূল তথ্য ও বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস):

এম.কে

আরো পড়ুন

‘বাংলাদেশে হিন্দু নিগ্রহে’র প্রসঙ্গই নেই বাইডেনের দফতরের বিবৃতিতে!

ডিএনসিসি প্রশাসক এজাজের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রত্যাশিতই ছিলঃ ভারতীয় বিশেষজ্ঞ