TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

‘বাণিজ্য হাব’ হওয়ার স্বপ্নে বড় ধাক্কা, ইসরায়েলকে পাশ কাটিয়ে বিকল্প পথ গড়ছে উপসাগরীয় দেশগুলো

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবে ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর (আইমেক) কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। যে প্রকল্পের মাধ্যমে ইসরায়েলকে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা ছিল, গাজা যুদ্ধ এবং পরবর্তী আঞ্চলিক সংঘাত সেই পরিকল্পনাকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলো এখন ইসরায়েলকে এড়িয়ে বিকল্প বাণিজ্যপথ নির্মাণে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৩ সালে ঘোষিত আইমেক প্রকল্পের অন্যতম ভিত্তি ছিল ইসরায়েলের হাইফা বন্দরকে ইউরোপমুখী প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহার করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভারতের পণ্য সমুদ্রপথে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পৌঁছে সেখান থেকে রেলপথে সৌদি আরব, জর্ডান ও ইসরায়েল হয়ে ইউরোপে যাবে। এই উদ্যোগকে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের বিকল্প হিসেবেও দেখা হয়েছিল।

কিন্তু গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কার্যত থমকে যায়। পরবর্তীতে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এদিকে সৌদি আরব ও তুরস্ক ঐতিহাসিক হেজাজ রেলপথ পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক সই করেছে। এই রেলপথ জর্ডান ও সিরিয়ার মধ্য দিয়ে দুই দেশকে যুক্ত করবে এবং পরিকল্পনাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে ইসরায়েলকে এড়িয়ে বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত সিরিয়ার উপকূল থেকে ইরাক হয়ে নিজেদের উপসাগরীয় বন্দর পর্যন্ত নতুন বাণিজ্যপথ তৈরির আলোচনা শুরু করেছে। একই সঙ্গে দেশটির বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড ফুজাইরাহ উপকূলে নতুন কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে। এর লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি এবং ইসরায়েলি বন্দর এড়িয়ে নিরাপদে পণ্য পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি করা।

বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর নতুন উদ্যোগগুলোর একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলো—আঞ্চলিক বাণিজ্য চালু রাখা, তবে ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো।

সৌদি আরব ইতোমধ্যে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি মালবাহী রেল করিডর চালু করেছে, যা দেশটির প্রধান বন্দরগুলোকে জর্ডান সীমান্তের সঙ্গে যুক্ত করেছে। পাশাপাশি পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনও তাদের বিকল্প জ্বালানি পরিবহন সক্ষমতা জোরদার করেছে।

অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত বহুমুখী বাণিজ্যপথ তৈরির কৌশল নিয়েছে। দেশটি ইরাকের ১৭ বিলিয়ন ডলারের ‘ডেভেলপমেন্ট রোড’ প্রকল্পেও যুক্ত হয়েছে, যা তুরস্ক হয়ে সরাসরি ইউরোপে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব বিকল্প করিডরের সামনে এখনও বড় ধরনের বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের সিংহভাগ এখনও সমুদ্রপথে পরিচালিত হয় এবং একটি বড় কনটেইনারবাহী জাহাজ একসঙ্গে প্রায় ২৪ হাজার কনটেইনার পরিবহন করতে সক্ষম। সেই তুলনায় স্থলপথের রেল ও সড়ক করিডরের পরিবহন সক্ষমতা অনেক কম।

এছাড়া হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবও উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিবেচ্য বিষয় হয়ে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলকে ঘিরে পরিকল্পিত আঞ্চলিক বাণিজ্য কাঠামো বড় ধরনের ধাক্কা খেলেও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বাণিজ্য করিডর তৈরির প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকবে। তবে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা নিশ্চিত না হলে এসব উদ্যোগের পূর্ণ বাস্তবায়ন কঠিন হবে।

সূত্রঃ রয়টার্স \ ব্লুমবার্গ

এম.কে

আরো পড়ুন

৩০ হাজার অভিবাসীকে বৈধতা দেবে গ্রিস, সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশিদেরও

আরব দেশগুলোকে যুদ্ধে টানছে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রঃ রাশিয়া

নোবেল পেলেন না ট্রাম্প, এত বড় ‘অপমান’!

নিউজ ডেস্ক