29.6 C
London
June 27, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশমুক্তমত

বিশ্বকাপের রঙে রঙিন বাংলাদেশ, অথচ নিজের ফুটবল অন্ধকারে

নাশিত রহমান || লন্ডন  || ২৬ জুন ২০২৬

বাংলাদেশে ফুটবল একসময় ছিল জনগণের প্রধান বিনোদন, সামাজিক সংযোগের মাধ্যম এবং তরুণদের স্বপ্নের প্রতীক। কিন্তু আজ সেই ফুটবলই গভীর সংকটে। মাঠের অভাব, অবকাঠামোর দুরবস্থা, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ফুটবল এমন এক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হলেও পারফরম্যান্স তলানিতে। এ যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ: আবেগে ফুটবল আমাদের রক্তে, কিন্তু বাস্তবে ফুটবল আমাদের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশ রঙিন হয়ে ওঠে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকায় ঢাকা পড়ে শহর-গ্রাম, রাতভর চলে খেলা দেখা, বাজি ধরা, উল্লাস। কিন্তু এই উন্মাদনা বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখে না। আমরা বিদেশি দলের পতাকা টাঙাই, কিন্তু নিজেদের ফুটবলের পতন ঠেকাতে পারি না। এটাই আমাদের ফুটবল সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য—আবেগে আমরা বিশ্বমানের, বাস্তবে আমরা দক্ষিণ এশিয়ার তলানিতে।

বাংলাদেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। ব্রিটিশ আমলের মোহনবাগান-ইস্ট বেঙ্গল, স্বাধীনতার পর আবাহনী-মোহামেডানের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা—সব মিলিয়ে ফুটবল ছিল জাতীয় আবেগের কেন্দ্র। ১৯৮২ সালে বিটিভির প্রথম বিশ্বকাপ লাইভ সম্প্রচার এবং ১৯৮৬ সালে রঙিন সম্প্রচার ফুটবলকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। কিন্তু সেই ঐতিহ্য আজ স্মৃতির পাতায় বন্দী। মাঠে সাফল্য নেই, কাঠামো নেই, পরিকল্পনা নেই—শুধু আছে স্মৃতি আর উন্মাদনা।

মাঠ হারানোর মহামারি আজ বাংলাদেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় সংকট। গত দুই দশকে খেলার মাঠের সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি কমে গেছে—এটি কোনো অনুমান নয়, নগর পরিকল্পনা গবেষণার অভিন্ন পর্যবেক্ষণ। ঢাকায় প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য মাঠ থাকা উচিত ৬০টি, বাস্তবে আছে ১০টিরও কম। গ্রামে ব্যক্তিগত মালিকানা, জমির মূল্যবৃদ্ধি এবং কৃষিজমির সংকট মাঠকে বিলুপ্ত করছে আরও দ্রুতগতিতে। যে দেশে মাঠ নেই, সে দেশে ফুটবল প্রতিভা জন্মাবে কীভাবে? প্রতিভা জন্মানোর স্বাভাবিক পরিবেশই যখন ধ্বংস হয়ে গেছে, তখন আন্তর্জাতিক সাফল্যের স্বপ্ন কেবলই কাগুজে।

অবকাঠামোর অবস্থাও একই রকম হতাশাজনক। বাংলাদেশে এখনো নেই ফিফা-স্ট্যান্ডার্ড ট্রেনিং সেন্টার, নেই স্পোর্টস সায়েন্স ল্যাব, নেই ডেটা-অ্যানালিটিক্স ভিত্তিক কোচিং, নেই মানসম্মত যুব একাডেমি নেটওয়ার্ক। ফুটবলে বিনিয়োগের পরিমাণ বছরে ১০–১২ মিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশই অপচয় বা অদক্ষ ব্যবস্থাপনায় হারিয়ে যায়। এটি শুধু পিছিয়ে থাকা নয়—এটি উন্নয়নের প্রতি রাষ্ট্র ও প্রশাসনের উদাসীনতার প্রমাণ।

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) আজ এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়ে যেখানে দক্ষতা নয়, রাজনৈতিক আনুগত্যই নেতৃত্বের প্রধান যোগ্যতা। গত ২০ বছরে কোনো দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা নেই; যুব ফুটবলের বাজেটের ৩০–৪০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয় না; জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর ৭০ শতাংশ কার্যক্রম কাগজে-কলমে; ফিফা-এএফসি অনুদান ব্যবহারে নেই কোনো স্বচ্ছতা। সব মিলিয়ে স্পষ্ট—বাংলাদেশের ফুটবল প্রশাসন উদ্দেশ্য-অযোগ্য, অদক্ষ এবং অকার্যকর। 

সমাজ-অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ফুটবলের পতনকে আরও প্রকট করে। বিশ্বকাপ বা ইউরোপিয়ান লিগ চলাকালে বাংলাদেশে জার্সি, পতাকা, টিভি, বিজ্ঞাপন—সব মিলিয়ে শত কোটি টাকার বাজার তৈরি হয়। কিন্তু এই অর্থের এক টাকাও দেশের ফুটবল উন্নয়নে যায় না। খেলোয়াড়দের নিরাপদ ক্যারিয়ার পথ নেই, পরিবারগুলো খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে দেখতে চায় না, সরকারি বিনিয়োগ সীমিত, বেসরকারি খাতের আগ্রহ কম, আর প্রশাসনিক অদক্ষতা উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হলেও পারফরম্যান্স তলানিতে।

ফিফা র‌্যাংকিং এই পতনের নির্মম পরিসংখ্যান। বাংলাদেশ বর্তমানে ১৮১তম—২১১টি দেশের মধ্যে তলানির দিকে অবস্থান। গত ২০ বছরে বাংলাদেশ কখনোই ১৫০-এর ওপরে উঠতে পারেনি। এটি শুধু মাঠের ব্যর্থতা নয়—এটি কাঠামোগত পতনের প্রতিচ্ছবি।

তবুও কিছু আলো আছে। প্রবাসী বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের আগমন, নারীদের ফুটবলে সাফল্য, বেসরকারি একাডেমির বৃদ্ধি এবং তরুণদের ইউরোপিয়ান ফুটবলের প্রতি আকর্ষণ ভবিষ্যতের সম্ভাবনা তৈরি করে। কিন্তু সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে প্রয়োজন পেশাদার নেতৃত্ব, দীর্ঘমেয়াদি নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন।

বাংলাদেশের ফুটবলকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে এখনই পরিবর্তন জরুরি। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার ফুটবল ফেডারেশন গঠন করতে হবে; প্রতিটি জেলায় মাঠ, ট্রেনিং সেন্টার ও যুব একাডেমি পুনর্গঠন করতে হবে; স্কুল-কলেজ ফুটবল বাধ্যতামূলক করতে হবে; তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে হবে; প্রবাসী খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তির জন্য শক্তিশালী ট্যালেন্ট আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম তৈরি করতে হবে; এবং সর্বোপরি, বিদেশি দল সমর্থনের উন্মাদনাকে নিজেদের ফুটবল উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে।

বাংলাদেশের ফুটবলের সংকট কোনো একদিনে তৈরি হয়নি—এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা, অদক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের ফল। কিন্তু পরিবর্তন সম্ভব, যদি আমরা চাই। যদি আমরা মাঠ ফিরিয়ে দিই, অবকাঠামো গড়ে তুলি, প্রশাসনকে পেশাদার করি—তাহলে বাংলাদেশ ফুটবল আবারও উঠে দাঁড়াতে পারে।

বাংলাদেশে দীর্ঘ দুই দশক পরে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে—এটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতিনির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দেশের ফুটবলকে পুনরুজ্জীবিত করা এখন সময়ের দাবি। কারণ ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়—এটি সামাজিক সংহতি, যুবশক্তির বিকাশ, আন্তর্জাতিক পরিচিতি এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

দীর্ঘদিন ধরে ফুটবল অবহেলিত ছিল। মাঠ কমেছে, অবকাঠামো ভেঙেছে, প্রশাসন অদক্ষ হয়েছে, আর রাজনৈতিক প্রভাব ফুটবলকে পঙ্গু করে তুলেছে। গণতান্ত্রিক সরকার যদি সত্যিই জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেয়, তবে ফুটবলের উন্নয়নকে একটি জাতীয় নীতিঅগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

আরো পড়ুন

করোনাকালে ঘুড়ি বিক্রির ধুম

অনলাইন ডেস্ক

সাহেদ একজন চতুর অপরাধী: আদালত

অনলাইন ডেস্ক

“বাংলাদেশে কোনো হিন্দুবিরোধী সহিংসতা নেই”—মুহাম্মদ ইউনূসের দাবি