19.9 C
London
October 1, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিকফিচার

বৈদ্যুতিক চেয়ারে মাথায় আগুন, প্রাণঘাতী ইনজেকশনে রক্তে ভাসল মৃত্যুকক্ষ—যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ ‘ব্যর্থ’ মৃত্যুদণ্ডের ইতিহাস

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় ভয়াবহ ভুল ও জটিলতার একাধিক ঘটনা ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রে। বৈদ্যুতিক চেয়ারে বসানোর পর আসামির মাথায় আগুন ধরে যাওয়া থেকে শুরু করে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের সময় বারবার ব্যর্থতা, বমি, রক্তপাত এবং দীর্ঘ সময় ধরে মৃত্যু না হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। সম্প্রতি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় দুই দফা প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার পরও বেঁচে যাওয়া খ্রিস্টা পাইকের ঘটনা সামনে আসার পর এসব পুরোনো ঘটনার দিকে আবারও নজর পড়েছে।

দ্য সানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক ঘটনায় ৫০ বছর বয়সী খ্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া সফল হয়নি। ১৯৯৬ সালে ১৯ বছর বয়সী কোলিন স্লেমারকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত পাইককে প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার পরও তাকে জীবিত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় পাইক ব্যথার অভিযোগ করেন এবং বারবার পা নাড়াচ্ছিলেন। তার আইনজীবীরা আগে থেকেই আদালতে যুক্তি দিয়েছিলেন, পাইকের বিরল রক্তজনিত সমস্যার কারণে প্রাণঘাতী ওষুধ পেন্টোবারবিটাল তার শরীরে স্বাভাবিক গতিতে কাজ নাও করতে পারে এবং এতে দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র যন্ত্রণা হতে পারে।

ঘটনার পর পাইকের আইনজীবীরা তাকে ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অনুরোধের কথাও জানান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে পাইকের ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থতার একমাত্র উদাহরণ নয়। ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের একটি গবেষণায় দেখা যায়, ১৮৯০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৮ হাজার ৭৭৬টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মধ্যে ২৭৬টি বা ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ব্যর্থ’ বা ত্রুটিপূর্ণ মৃত্যুদণ্ড হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল।

এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি জেসি টাফেরোর মৃত্যুদণ্ড। ১৯৯০ সালে ফ্লোরিডায় বৈদ্যুতিক চেয়ারে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় যন্ত্রটি তিনবার সমস্যায় পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টাফেরোর মাথায় প্রায় ছয় ইঞ্চি উচ্চতার আগুনের শিখা দেখা যায়। ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করা ব্যক্তিরা ধোঁয়া ও আগুনের ভয়াবহ দৃশ্য দেখেছিলেন।

টাফেরোর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা নিয়ে তীব্র সমালোচনার পর ফ্লোরিডা বৈদ্যুতিক চেয়ার ব্যবহার থেকে সরে এসে প্রাণঘাতী ইনজেকশনকে প্রধান পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করে।

আরেকটি বহুল আলোচিত ঘটনা ক্লেটন লকেটের। ২০১৪ সালের ২৯ এপ্রিল ওকলাহোমায় তার প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তার শরীরে উপযুক্ত শিরা খুঁজে পেতে চিকিৎসকরা নয়বার চেষ্টা করেন। হাত, ঘাড়, কলারবোন ও পায়ের বিভিন্ন স্থানে সুচ প্রবেশ করানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

শেষ পর্যন্ত কুঁচকির একটি শিরায় সুচ প্রবেশ করানো সম্ভব হয়। এরপর প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগ করা হলে কয়েক মিনিট পর লকেট প্রচণ্ডভাবে ছটফট করতে শুরু করেন এবং চিৎকার করেন। দ্বিতীয়বার ওষুধ প্রয়োগের সময় সুচ ধমনীতে ঢুকে যাওয়ায় রক্ত ছিটকে পড়ে এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের শরীরেও রক্ত লাগে।

পরে লকেটকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও পথেই হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়।

১৯৮৩ সালে জিমি লি গ্রের মৃত্যুদণ্ডও ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে সম্পন্ন হয়। অপহরণ, ধর্ষণ ও তিন বছর বয়সী এক শিশুকে হত্যার দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। প্রাণঘাতী গ্যাস প্রয়োগের সময় পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না হওয়ায় দ্রুত তার মৃত্যু হয়নি। পরে তিনি স্ট্রেচার থেকে পড়ে মাথায় আঘাত পান। প্রত্যক্ষদর্শীরা তার শেষ মুহূর্তে একাধিকবার গোঙানোর শব্দ শুনেছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

আরেকটি আলোচিত ঘটনা ১৪ বছর বয়সী জর্জ স্টিনির। ১৯৪৪ সালে দক্ষিণ ক্যারোলিনায় দুই কিশোরীকে হত্যার দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। স্টিনি এতটাই ছোট ছিলেন যে বৈদ্যুতিক চেয়ারে বসানোর সময় তাকে একটি বইয়ের ওপর বসাতে হয়েছিল। তার মুখ ঢাকার জন্য ব্যবহৃত মুখোশটিও তার জন্য বড় ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলায় প্রমাণের ঘাটতি ছিল এবং পুলিশ দাবি করেছিল যে জিজ্ঞাসাবাদের সময় স্টিনি হত্যার কথা স্বীকার করেছিলেন। বিচারকাজে জুরি মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রায় ৭০ বছর পর দক্ষিণ ক্যারোলিনার একটি আদালত তার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করে।

বৈদ্যুতিক চেয়ারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় জন লুইস ইভান্সের ঘটনাও ভয়াবহতার উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। ১৯৮৩ সালের ২২ এপ্রিল তাকে বৈদ্যুতিক চেয়ারে বসানো হয়। প্রায় ১ হাজার ৯০০ ভোল্টের বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার পরও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মারা যাননি।

এ সময় একটি ইলেকট্রোড খুলে যায় এবং মুখ ঢেকে রাখা হুডের নিচ থেকে ধোঁয়া ও স্ফুলিঙ্গ বের হতে দেখা যায় বলে তার আইনজীবী রাসেল কানান বর্ণনা করেছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা পোড়া মাংস ও পোশাকের তীব্র গন্ধ পাওয়ার কথাও জানান।

২০২১ সালের জন ম্যারিয়ন গ্রান্টের মৃত্যুদণ্ডও প্রাণঘাতী ইনজেকশন পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। কারাগারের এক কর্মীকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া গ্রান্টকে মিডাজোলামসহ ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু ইনজেকশন দেওয়ার পর তিনি দ্রুত বমি করতে শুরু করেন। কারাগারের কর্মীদের তার মুখ পরিষ্কার করতে হয়।

প্রথমবার ওষুধ প্রয়োগের ২১ মিনিট পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। প্রসিকিউটর জুলি গার্ডনার ঘটনাটিকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

এদিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। বৈদ্যুতিক চেয়ার, প্রাণঘাতী গ্যাস এবং প্রাণঘাতী ইনজেকশন—বিভিন্ন পদ্ধতির ক্ষেত্রে অতীতে জটিলতা ও ব্যর্থতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

দ্য সানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈদ্যুতিক চেয়ার বিশ্বের বহু দেশে নিষিদ্ধ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে এখনো বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে এটি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় কোনো প্রক্রিয়াগত ব্যর্থতা হলে তা নিয়ে আইনি ও মানবাধিকার বিতর্কও তৈরি হয়।

সম্প্রতি খ্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে—মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্ধারিত পদ্ধতিগুলো কতটা নির্ভরযোগ্য এবং এসব প্রক্রিয়ার সময় অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা দেখা দিলে তার আইনি ও মানবিক পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

সূত্রঃ দ্য সান

এমকে

আরো পড়ুন

ট্রাম্পকে আমিরাতের ধনকুবেরঃ ইরানে যুদ্ধ শুরু করার ক্ষমতা আপনাকে কে দিয়েছে

নিউজ ডেস্ক

ভিসা ছাড়াই যে ১৫৫ দেশে যেতে পারবেন ব্রিটিশ নাগরিকেরা

নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে হার্ভার্ডের ৯২% মুসলিম শিক্ষার্থী