ব্রেক্সিট গণভোটের এক দশক পূর্তির প্রাক্কালে প্রকাশিত এক নতুন জরিপে দেখা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যুক্তরাজ্যের পুনরায় সদস্যপদ লাভের পক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ইউরোপীয় নাগরিক সমর্থন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ব্রিটেনের বিপুল সংখ্যক ভোটার মনে করছেন, ব্রেক্সিট তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি এবং দেশের অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, বাণিজ্য ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (ইসিএফআর)-এর পরিচালিত এই জরিপে ১৫টি ইউরোপীয় দেশের নাগরিকদের মতামত নেওয়া হয়। ফলাফলে দেখা যায়, গড়ে ৬৬ শতাংশ ইউরোপীয় উত্তরদাতা যুক্তরাজ্যের ইইউতে পুনরায় যোগদানের পক্ষে অথবা অন্তত এ বিষয়ে আপত্তিহীন অবস্থানে রয়েছেন।
দেশভেদে সমর্থনের হার ভিন্ন হলেও অধিকাংশ দেশেই ইতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে। বুলগেরিয়ায় ৫৬ শতাংশ, ফ্রান্স ও ইতালিতে ৫৯ শতাংশ এবং নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্কে ৭৫ শতাংশ মানুষ যুক্তরাজ্যের প্রত্যাবর্তনের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ইউরোপের বিভিন্ন ডানপন্থী ও ইউরো-সন্দেহবাদী রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যেও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে। পোল্যান্ডের কনফেডারেশন পার্টির ৭১ শতাংশ, জার্মানির এএফডি দলের ৫৮ শতাংশ এবং ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালির ৫৮ শতাংশ সমর্থক যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারের পক্ষে মত দিয়েছেন।
ইউরোপের শীর্ষ নেতারাও এ ধরনের মনোভাবের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ অতীতে বলেছেন, যুক্তরাজ্যের জন্য ইইউর দরজা “সবসময় খোলা”। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও প্রকাশ্যে ব্রিটেনের পুনরায় সদস্যপদ লাভের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব সম্প্রতি মন্তব্য করেন, “ইউরোপে আমাদের একটি ব্রিটিশ কণ্ঠস্বর প্রয়োজন। আমরা সত্যিই তোমাদের মিস করি।”
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, রাজনৈতিক বিভাজন নির্বিশেষে ব্রিটিশ ভোটারদের বড় অংশ এখন ব্রেক্সিটকে নেতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করছেন। জরিপ অনুযায়ী, ৬৬ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক মনে করেন ব্রেক্সিট জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি করেছে। ৬৫ শতাংশের মতে এটি অর্থনীতির ক্ষতি করেছে, ৫৭ শতাংশের মতে তরুণদের সুযোগ-সুবিধা কমিয়েছে এবং ৫৬ শতাংশের মতে বাণিজ্য ও অবৈধ অভিবাসন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
অবাক করার মতো বিষয় হলো, ২০১৬ সালের গণভোটে ইইউ ত্যাগের পক্ষে ভোট দেওয়া নাগরিকদের ৫৮ শতাংশও এখন মনে করেন, ব্রেক্সিট অবৈধ অভিবাসন কমানোর পরিবর্তে পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।
জরিপে ব্রেক্সিটের প্রধান সুফল সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে সর্বাধিক উত্তরদাতা বলেছেন “জানি না”। এর পরেই ছিল “উপরের কোনোটিই নয়” উত্তরটি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইঙ্গিত করে যে ব্রিটিশ জনমতের একটি বড় অংশ এখন বিশ্বাস করে ব্রেক্সিট প্রত্যাশিত সুবিধা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
এই হতাশার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নেও। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৫ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক ইইউর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে মত দিয়েছেন। ৬৬ শতাংশ বলেছেন, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বাড়ানো উচিত।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলো, ৬৩ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক—যাদের মধ্যে ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট সমর্থকদেরও উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে—বাণিজ্যিক সুবিধা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিনিময়ে ইউরোপীয় নাগরিকদের মুক্ত চলাচলের অধিকার পুনর্বহাল মেনে নিতে প্রস্তুত। এমনকি যেসব ভোটারের প্রধান উদ্বেগ অভিবাসন, তাদের মধ্যেও ৪৪ শতাংশ এই সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
ইসিএফআরের পরিচালক ও প্রতিবেদনের লেখক মার্ক লিওনার্ড বলেন, জরিপের ফলাফল প্রমাণ করে যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাজ্যের প্রত্যাবর্তনের জন্য উন্মুক্ত এবং ব্রিটিশ জনগণও ২০১৬ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে।
তার ভাষায়, “ব্রেক্সিট ছিল বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহের রাজনৈতিক বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এক দশক পরে ব্রিটিশরা উপলব্ধি করছে যে ইইউর বাইরে আরও ভালো ভবিষ্যতের যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি।”
নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ইস্যুতেও ব্রিটিশ জনমতে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জরিপে মাত্র ১৮ শতাংশ উত্তরদাতা যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে দেখেছেন। বিপরীতে ৫৮ শতাংশ ইউরোপের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পক্ষে মত দিয়েছেন।
এছাড়া অধিকাংশ ব্রিটিশ নাগরিক যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি অস্ত্র কেনার পরিবর্তে “বাই ইউরোপিয়ান” নীতি অনুসরণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৩ শতাংশ মানুষ ইউরোপের বিকল্প পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগে যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণ সমর্থন করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই জরিপের ফলাফল শুধু ব্রেক্সিট-পরবর্তী জনমতের পরিবর্তনই তুলে ধরছে না; বরং এটি ইঙ্গিত করছে যে আগামী বছরগুলোতে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে আরও গভীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত হতে পারে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

