17.8 C
London
September 15, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিকযুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটেনে এআইয়ের ভয়ংকর ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্কতাঃ ‘কিল সুইচ’ বাধ্যতামূলক করার দাবি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। উন্নত এআই ব্যবস্থা আগামী ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যেই এমন সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, যার মাধ্যমে পুরো ইন্টারনেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মতো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও অ্যামোডেই।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যানথ্রপিকের প্রধানের সতর্কতার পর এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের অবস্থানও সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম উন্নত এআই ব্যবস্থার সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের প্রকাশ্যে আলোচনা করাকে সমর্থন করেছেন। তবে এআই উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানাননি তিনি।

ডাউনিং স্ট্রিটের এক মুখপাত্র বলেন, সবচেয়ে উন্নত এআই ব্যবস্থা তৈরি করা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন প্রযুক্তির সম্ভাবনার পাশাপাশি এর ঝুঁকি নিয়েও প্রকাশ্যে আলোচনা করছে—এটি ইতিবাচক বিষয়। সরকারের মতে, এসব ঝুঁকি কোনো একটি দেশের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাই উন্নত এআই তৈরি করা প্রতিষ্ঠান, মিত্র দেশ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ব্রিটেন ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।

দারিও অ্যামোডেই বলেন, চলতি গ্রীষ্মের পর থেকে এআই প্রযুক্তির অগ্রগতি “নাটকীয়ভাবে দ্রুত” হয়েছে। বর্তমান গতিতে প্রযুক্তির উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে এআই এমন সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, যার মাধ্যমে একটি এআই-চালিত ব্যবস্থা পুরো ইন্টারনেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে সক্ষম হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

অ্যানথ্রপিকের প্রধান তার ‘উই মাস্ট পেস দ্য ফ্রন্টিয়ার’ শীর্ষক লেখায় এআই প্রযুক্তির উন্নয়নকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ গতিতে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিন দফা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন। তার এই উদ্যোগকে এআই খাতের আরও কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তিত্ব সমর্থন করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন গ্রোকের প্রধান ইলন মাস্ক এবং ওপেনএআইয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্যাম অল্টম্যান।

এদিকে ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, এআই প্রযুক্তি শুধু ঝুঁকিই তৈরি করছে না, এর মাধ্যমে সরকারি সেবা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নেরও বড় সুযোগ রয়েছে। ডাউনিং স্ট্রিটের মুখপাত্র বলেন, সরকার এই সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে চায়।

এআই প্রযুক্তির ঝুঁকি মূল্যায়নে ব্রিটেনে এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট কাজ করছে। এর লক্ষ্য হলো সবচেয়ে উন্নত এআই ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং সেগুলো থেকে তৈরি হতে পারে এমন ঝুঁকি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ও প্রমাণভিত্তিক ধারণা তৈরি করা, যাতে নীতিনির্ধারণ অনুমানের পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা যায়।

তবে এআই নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপের দাবি উঠেছে। অ্যানথ্রপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্ক এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক ‘কিল সুইচ’ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, এআই মডেল বিপজ্জনকভাবে কাজ করলে তা বন্ধ করার জন্য এমন একটি ব্যবস্থা থাকা উচিত, যা স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরীক্ষা করা যাবে।

ক্লার্ক জানিয়েছেন, অ্যানথ্রপিকের নিজস্ব এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে এবং অধিকাংশ এআই গবেষণাগারেরও কোনো না কোনোভাবে মডেল বন্ধ করার সুযোগ রয়েছে। তবে তার মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করার প্রয়োজন হতে পারে।

এর আগে গত সপ্তাহে ব্রিটিশ সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো এআই মডেলে হস্তক্ষেপ বা সেটি বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা দিতে পারে—এমন ‘কিল সুইচ’ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। সরকারের যুক্তি ছিল, এআই প্রযুক্তি সীমান্ত অতিক্রম করে পরিচালিত হয় এবং ব্রিটেন এককভাবে পুরো এআই ব্যবস্থা বন্ধ করে দিতে পারে না।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআই উন্নয়নের গতি কমানোর বিষয়ে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন। চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র যেন পিছিয়ে না পড়ে, সে বিষয়টি তার অবস্থানের অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।

এআইয়ের সম্ভাব্য মানবাধিকার ঝুঁকি নিয়েও ব্রিটেনে সতর্কতা জারি হয়েছে। পার্লামেন্টের বিভিন্ন দলের এমপি ও লর্ডদের সমন্বয়ে গঠিত জয়েন্ট কমিটি অন হিউম্যান রাইটস (জেসিএইচআর) সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে নতুন এআই আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যমান ব্রিটিশ আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো এআই প্রযুক্তির কারণে তৈরি হতে পারে এমন মানবাধিকার ঝুঁকি মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন যেখানে মূলত ব্যবহারকারীর ওপর গুরুত্ব দেয়, সেখানে প্রযুক্তি নির্মাতাদের নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির বিষয়টি যথেষ্টভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে না।

কমিটি আরও বলেছে, এআই ব্যবস্থা মানুষের গোপনীয়তার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে কোনো এআই ব্যবস্থার নেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার অধিকারও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

জেসিএইচআরের চেয়ারম্যান লেবার এমপি অ্যালেক্স সোবেল বলেন, এআই প্রযুক্তি এত দ্রুত এবং জটিলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে যে এর প্রভাব সঠিকভাবে পূর্বানুমান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তার মতে, সম্ভাব্য গুরুতর পরিণতি মোকাবিলার জন্য বর্তমানে ব্রিটেনসহ বিশ্বের কোনো দেশই যথেষ্ট প্রস্তুত নয়।

তিনি বলেন, এআই প্রযুক্তির পুরো সরবরাহব্যবস্থা থেকে শুরু করে এর জীবনচক্রের প্রতিটি পর্যায়কে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ব্যাপক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে নতুন আইন প্রয়োজন।

কমিটি একই সঙ্গে একটি একক এআই নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছে। এই সংস্থার দায়িত্ব হবে এআই-সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণ, প্রযুক্তির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে আইন প্রয়োগ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

এদিকে ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এআই প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও ঝুঁকি—দুই বিষয়েই আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে। তবে প্রযুক্তির উন্নয়ন ইচ্ছাকৃতভাবে ধীর করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি তার কার্যালয়।

এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ, সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি, মানবাধিকারের ওপর প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ব্রিটেনে একই সময়ে সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং পার্লামেন্টারি কমিটির পৃথক সতর্কবার্তা সামনে আসায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সূত্রঃ ডেইলি এক্সপ্রেস

এম.কে

আরো পড়ুন

“বেনিফিট সাহায্য নাকি ফাঁদ” – বেনিফিট ব্যবস্থায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি কনজার্ভেটিভ নেতা ব্যাডেনোকের

যুক্তরাজ্যে মে মাসে আসছে ট্রেন ধর্মঘটের ডাক

‘জ্বিন সেজে নিরাময়ের নামে ধর্ষণ’: পূর্ব লন্ডনের ইমামের ১১ বছরের নৃশংসতা