ব্রিটেনের পরবর্তী বড় নিরাপত্তা সংকট আর সীমান্ত, বিমানবন্দর বা সামরিক ঘাঁটি দিয়ে শুরু নাও হতে পারে। দেশটির নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় হুমকি আসতে পারে মানুষের বাড়ির ব্রডব্যান্ড সংযোগ, মোবাইল ফোন এবং দৈনন্দিন ডিজিটাল সেবার ওপর পরিচালিত সাইবার হামলার মাধ্যমে।
যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ (GCHQ)-এর প্রধান অ্যান কিস্ট-বাটলার বলেছেন, ব্রিটেন ও তার মিত্ররা এখন “শান্তি ও যুদ্ধের মাঝামাঝি এক অবস্থায়” রয়েছে। তার অভিযোগ, রাশিয়া প্রতিদিন পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে হাইব্রিড কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে এবং চীন, রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়া বিশ্বব্যাপী ৭৫ শতাংশের বেশি ক্ষতিকর সাইবার অপারেশনের জন্য দায়ী।
তার মতে, সাইবার নিরাপত্তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যতে পশ্চিমা দেশগুলো বড় ধরনের সাইবার যুদ্ধে পিছিয়ে পড়তে পারে। তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে তিন দশক কাজ করার অভিজ্ঞতায় এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তিনি খুব কমই দেখেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন গড় ব্রিটিশ নাগরিক প্রতি ১২ মিনিটে অন্তত একবার কোনো না কোনো ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করেন। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে দিনের শেষ পর্যন্ত ট্রেনে রেলকার্ড ব্যবহার, টিউবে যাতায়াত, জিপির অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং, ব্যাংকের বিল পরিশোধ, অনলাইন কেনাকাটা এবং আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ—সবকিছুই ডিজিটাল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এসব ব্যবস্থা অচল হয়ে গেলে সুপারমার্কেটের তাক খালি হয়ে যেতে পারে, মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হতে পারে, সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম থেমে যেতে পারে এবং হাজারো পরিবার দৈনন্দিন জীবন পরিচালনায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে পারে।
প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক কয়েকটি সাইবার হামলার উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। গত নভেম্বরে এনএইচএসের রক্ত পরীক্ষার একটি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান র্যানসমওয়্যার হামলার শিকার হলে হাজার হাজার চিকিৎসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল বা পিছিয়ে যায়। একইভাবে মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার এবং কো-অপ-এর ওপর সাইবার হামলায় দোকানের পেমেন্ট ব্যবস্থা, অনলাইন অর্ডার এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।
বিশ্বের অন্যতম উন্নত ডিজিটাল অর্থনীতির দেশ হওয়ায় ব্রিটেন আরও বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর ওপর সাইবার হামলা চার গুণ বেড়েছে, যা দেশটির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এ বছরের শুরুতে টেলিকম সার্বিজা গ্রুপ-এর সার্ভারে হামলা চালিয়ে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করা হয় এবং প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীকে চাঁদাবাজির চেষ্টা করা হয়। বিশ্লেষকদের ধারণা, রাশিয়াপন্থী একটি গোষ্ঠী এ হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল এবং পশ্চিমমুখী ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলার কারণেও প্রতিষ্ঠানটি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইন্টারনেট-সংযুক্ত যেকোনো যন্ত্রে গোপন প্রবেশপথ বা “ব্যাকডোর” তৈরি করা সম্ভব। এ কারণেই যুক্তরাজ্য তাদের ৫জি নেটওয়ার্কে চীনা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে-র সরঞ্জাম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়। ব্রিটিশ আইনপ্রণেতাদের আশঙ্কা ছিল, চীনের আইনের কারণে প্রয়োজনে বেইজিং সরকার হুয়াওয়েকে তথ্য হস্তান্তরে বাধ্য করতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার (NCSC) সতর্ক করেছে, র্যানসমওয়্যার ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম বড় নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠতে পারে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ গ্রিডে হামলা হয়ে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হতে পারে, বেতন পরিশোধ বিলম্বিত হতে পারে, এটিএম বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার নিরাপত্তাকে আর শুধু আইটি বিভাগের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। টেলিকম প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, খুচরা বিক্রেতা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে বড় ধরনের সাইবার হামলার মধ্যেও সেবা চালু রাখার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ব্রিটেনকে নিজস্ব সাইবার বিশেষজ্ঞ তৈরিতে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত রাখতে হবে।
প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা হয়েছে, একসময় দেশের নিরাপত্তা মানেই ছিল সীমান্ত, বন্দর ও বিমানবন্দর রক্ষা করা। এখন সেই নিরাপত্তার বড় অংশ নির্ভর করছে সার্ভার, মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং অদৃশ্য ডিজিটাল অবকাঠামোকে সুরক্ষিত রাখার ওপর। ভবিষ্যতের বড় সাইবার হামলা ধনী-গরিব বা শহর-গ্রাম কোনো পার্থক্য করবে না; বরং পরীক্ষা করবে ব্রিটেন ২১ শতকের এই নতুন হুমকির জন্য কতটা প্রস্তুত।
সূত্রঃ দ্য এক্সপ্রেস
এম.কে

