ব্রিটেনে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম আজ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আনলেডেড পেট্রোলের গড় দাম প্রতি লিটারে ১৭২.০ পেন্সে এবং ডিজেলের দাম ১৯৫.৭ পেন্সে পৌঁছেছে। সেপ্টেম্বরে এখন পর্যন্ত জ্বালানির দাম ১০ পেন্সের বেশি বেড়েছে।
জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে গাড়িচালকদের পাম্পে আগের তুলনায় বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে। একই সময়ে দেশটির সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিও ৩.১ শতাংশে পৌঁছেছে।
জ্বালানির খরচ কমানোর উপায় খুঁজতে অনলাইনে মানুষের আগ্রহও বেড়েছে। গত এক বছরে ‘কাছাকাছি কোথায় জ্বালানির দাম কম’—এ ধরনের অনুসন্ধান ২৩৬ শতাংশ বেড়েছে। গত তিন মাসে জ্বালানি খরচ কমানোর উপায় নিয়ে অনুসন্ধান বেড়েছে ১১০ শতাংশ।
এই পরিস্থিতিতে গাড়িচালকদের জ্বালানি সাশ্রয়ের কয়েকটি সহজ পদ্ধতি জানিয়েছেন মোটরিং বিশেষজ্ঞ পল জনসন। তিনি ভার্টু নিসান উইডনেসের ফোরকোর্ট ম্যানেজার। তার পরামর্শের মধ্যে রয়েছে গাড়ি চালানোর সময় ঘণ্টায় ৬০ মাইলের একটি নির্দিষ্ট গতি বজায় রাখা।
প্রথমত, সামনে গাড়ি ধীর হলে দ্রুত গতি বাড়িয়ে পরে হঠাৎ ব্রেক না করে আগেভাগেই অ্যাক্সিলারেটর থেকে পা সরিয়ে ইঞ্জিনের সাহায্যে গাড়ির গতি কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যানজটের মধ্যে অনেক চালক সামনের গাড়ির কাছাকাছি গিয়ে দ্রুত ব্রেক করেন। এতে জ্বালানি অপচয় বাড়ে।
সরকারের পরিবেশবান্ধব গাড়ি চালানোর নির্দেশনা অনুযায়ী, বারবার থামা ও চলার মতো যানজটে আক্রমণাত্মকভাবে গতি বাড়ানো ও ব্রেক করলে জ্বালানি খরচ ১০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। আধুনিক ফুয়েল-ইনজেক্টেড ইঞ্জিনে চালক অ্যাক্সিলারেটর ছেড়ে দিলেও গাড়ি গিয়ারে থাকা অবস্থায় ইঞ্জিন জ্বালানি সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে পারে। ফলে গাড়ির গতি কমার সময় অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার হয় না।
সামনের গাড়ির সঙ্গে কিছুটা বেশি দূরত্ব রেখে এবং রাস্তার আরও সামনের যান চলাচলের পরিস্থিতি আগে থেকে বুঝে গাড়ি চালালে অপ্রয়োজনীয় ব্রেক করার প্রয়োজন কমে। এতে জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, রাস্তার পরিস্থিতি অনুমতি দিলে ঘণ্টায় ৬০ মাইল গতি বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রাস্তা ফাঁকা থাকলে অনেক চালক সর্বোচ্চ বৈধ গতিতে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু গতি যত বাড়ে, বাতাসের প্রতিরোধও তত বাড়ে এবং ইঞ্জিনকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। ফলে জ্বালানি খরচ বেড়ে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তন কমিটি জানিয়েছে, ঘণ্টায় ৬০ মাইলের পরিবর্তে ৭০ মাইল গতিতে গাড়ি চালালে প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি জ্বালানি ব্যবহার হতে পারে। রাস্তার অবস্থা অনুকূল হলে খোলা ও সমতল রাস্তায় ঘণ্টায় ৬০ মাইলের স্থির গতি এবং ক্রুজ কন্ট্রোল ব্যবহার করলে জ্বালানি অপচয় কমানো সম্ভব।
২০ মাইল পথ যেতে ৭০ মাইলের পরিবর্তে ৬০ মাইল গতিতে গাড়ি চালালে যাত্রার সময় প্রায় দুই মিনিট বাড়তে পারে। তবে নিয়মিত গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে এতে জ্বালানি খরচে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় হতে পারে।
তৃতীয়ত, অপ্রয়োজনে গাড়ির ইঞ্জিন চালু রেখে দাঁড়িয়ে থাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। স্কুলে সন্তান নেওয়া-দেওয়া, মোড়, পথচারী পারাপারের স্থান ও যানজটপূর্ণ এলাকায় গাড়ি কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। এ সময় কোনো দূরত্ব অতিক্রম না করেই ইঞ্জিন চালু থাকলে জ্বালানি খরচ হয়।
যদি যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকে এবং কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে হয়, নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিস্থিতিতে ইঞ্জিন বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গাড়িতে স্বয়ংক্রিয় স্টপ-স্টার্ট প্রযুক্তি থাকলে সেটি ব্যবহার করাও জ্বালানি সাশ্রয়ে সহায়ক হতে পারে।
ব্রিটেনের হাইওয়ে কোডের ১২৩ নম্বর নিয়মেও বলা হয়েছে, জনসাধারণের ব্যবহারের রাস্তায় গাড়ি স্থির থাকা অবস্থায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইঞ্জিন চালু রাখা যাবে না।
চতুর্থত, নিয়মিত টায়ারের চাপ পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। টায়ারে সঠিক পরিমাণের চেয়ে কম বা বেশি বাতাস থাকলে রাস্তার সঙ্গে ঘর্ষণ বা রোলিং রেজিস্ট্যান্স বেড়ে যায়। ফলে গাড়ির ইঞ্জিনকে বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে হয় এবং জ্বালানি খরচও বাড়ে।
গাড়ির চারটি টায়ারের চাপ প্রস্তুতকারকের নির্ধারিত মাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত। সাধারণত চালকের দরজার ভেতরের ফ্রেমে থাকা স্টিকার অথবা গাড়ির মালিকের নির্দেশিকায় এই তথ্য দেওয়া থাকে।
গাড়িতে অতিরিক্ত যাত্রী বা লাগেজ বহন করার পর টায়ারের চাপ বাড়ানো হয়ে থাকলে, স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার পর প্রস্তুতকারকের নির্ধারিত চাপ অনুযায়ী আবার সেটি ঠিক করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে নির্ভুল ফলের জন্য ঠান্ডা অবস্থায় টায়ারের চাপ পরীক্ষা করা উচিত। একই সঙ্গে টায়ারে দৃশ্যমান ক্ষতি, অস্বাভাবিক ক্ষয় এবং টায়ারের ট্রেডের বৈধ সীমা ঠিক আছে কি না, তাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এদিকে সেপ্টেম্বরে ব্রিটেনে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ার পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং তেল শোধনাগারে ক্ষতির কারণে বৈশ্বিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৬ ডলারের ওপরে উঠেছে।
জ্বালানি খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফার হার নিয়েও ক্যাম্পেইন সংগঠন ফেয়ারফুয়েলইউকে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের বক্তব্য, খুচরা বিক্রেতাদের বাড়তি মুনাফার কারণে পাম্পে গাড়িচালকদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বাড়ছে।
জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছে আরএসি। সংস্থাটির মতে, অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকলে পেট্রোল ও ডিজেলের খুচরা দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান দামে একটি সাধারণ পারিবারিক পেট্রোলচালিত গাড়ির ট্যাংক পূর্ণ করতে প্রায় ৯৪ পাউন্ড খরচ হচ্ছে, যা সেপ্টেম্বরের শুরুতে একই পরিমাণ জ্বালানি ভরার তুলনায় প্রায় ৫ পাউন্ড বেশি।
ব্রিটেনে কাছাকাছি কোন পেট্রোল স্টেশনে জ্বালানির দাম কম, তা জানতে সরকারি ফুয়েল ফাইন্ডার ব্যবস্থার তথ্য সংগ্রহকারী বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করা যায়। এসব সেবায় পোস্টকোড বা মোবাইলের জিপিএস ব্যবহার করে কাছাকাছি পেট্রোল, ডিজেল বা প্রিমিয়াম জ্বালানির দাম তুলনা করা সম্ভব।
সূত্রঃ ডেইলি এক্সপ্রেস
এমকে

