TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটেনে ২,৭০০ একরের বেশি জমি কিনে সাম্রাজ্য গড়ছেন দক্ষিণ আফ্রিকার এক ধনকুবেরঃ ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা

ব্রিটেনের সোমারসেট অঞ্চলে হাজার হাজার একর জমি, বিলাসবহুল হোটেল, পানশালা ও বিভিন্ন স্থানীয় ব্যবসা কিনে নিজের প্রভাব বিস্তার করছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ধনকুবের কোস বেকার। তার মালিকানাধীন সম্পত্তির বিস্তার নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে। বন্যা, কৃষিজমিতে কীটনাশকের ব্যবহার, পানির প্রবাহ এবং স্থানীয় জনজীবনে প্রভাব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যতম বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নাসপার্সের চেয়ারম্যান কোস বেকারের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি পাউন্ড। তার প্রতিষ্ঠান এমিলি এস্টেটের মাধ্যমে সোমারসেটের ব্রুটন ও ক্যাসল ক্যারির আশপাশে ২ হাজার ৭০০ একরের বেশি জমি কেনা হয়েছে। বিস্তীর্ণ গ্রামীণ জমির পাশাপাশি তিনি স্থানীয় দোকান, খাবারের দোকান, সৌন্দর্যচর্চার প্রতিষ্ঠান, পুরোনো খামারবাড়ি ও পানশালাও কিনেছেন।

২০১৩ সালে বেকার ঐতিহাসিক হ্যাডস্পেন হাউস কিনে সেটিকে বিলাসবহুল হোটেলে রূপান্তর করেন। পরে তিনি ইয়ারলিংটন লজ নামে একটি ঐতিহাসিক বাড়িও অধিগ্রহণ করেন। বর্তমানে তার মালিকানাধীন নিউট ইন সোমারসেট হোটেলে এক রাত থাকার খরচ প্রায় ৮০০ পাউন্ড পর্যন্ত। হোটেলটির বাগান, ফলের বাগান, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটকদের আকর্ষণ করে। তবে এসব জায়গায় প্রবেশ করতে হোটেলের অতিথি হতে হয় অথবা বছরে ৮৫ পাউন্ডের প্রবেশ পাস কিনতে হয়।

স্থানীয়দের ক্ষোভের অন্যতম কারণ ক্যাসল ক্যারি রেলস্টেশনের নামের সঙ্গে হোটেলের নাম যুক্ত করা। স্টেশনটির সাইনবোর্ডে এখন ‘ক্যাসল ক্যারি ফর দ্য নিউট’ লেখা রয়েছে। খাবারবিষয়ক লেখক হিউ থমাস এ উদ্যোগকে ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও বেপরোয়া বলে সমালোচনা করেছেন। তার মতে, জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য থাকা একটি রেলস্টেশনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এমন প্রভাব বিস্তার উদ্বেগজনক।

স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের আশঙ্কা, ধনকুবেরের প্রতিষ্ঠান পানশালা ও অন্যান্য ব্যবসা অধিগ্রহণ করার পর সেগুলোর পণ্য ও সেবার দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। ক্যাসল ক্যারির জর্জ নামের একটি পানশালায় প্রবীণদের জন্য ১২ পাউন্ডে গরম খাবার পরিবেশন করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি নিউটের মালিকানায় যাওয়ার পর এই দাম বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। হোটেলের খামারের দোকানে এক প্যাকেট চকলেটের দাম ১১.৯৫ পাউন্ড এবং তাদের উৎপাদিত এক বোতল সাইডারের দাম ১২.৫০ পাউন্ড বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, নিউট প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আশপাশের এলাকায় বন্যার প্রকোপ বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ২০২৩ সালের মে মাসে নিউট এলাকার ওপর ভারী বৃষ্টির পর পিট ও ক্যাম উপত্যকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। স্থানীয় কাউন্সিলের ভাষায়, বন্যার মাত্রা ছিল জীবিত মানুষের স্মৃতিতে দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির বাইরে। ওই সন্ধ্যায় কর্তৃপক্ষ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে।

এমা ক্রেইজি নামে স্থানীয় এক লেখক অভিযোগ করেন, নিউটের পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় সড়ক নির্মাণ এবং পাথর-খোয়া ব্যবহারের কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিচের গ্রামগুলোতে নেমে এসে বন্যার পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে। নিউট কর্তৃপক্ষও পানি নিষ্কাশন নিয়ে উদ্বেগের কথা স্বীকার করেছে এবং খামার ও পাকা জায়গা থেকে নেমে আসা অতিরিক্ত পানি ধরে রাখতে জলাধার তৈরির কাজ করেছে।

কৃষিজমিতে কীটনাশক ব্যবহারের বিরুদ্ধেও স্থানীয় বাসিন্দারা পিটিশন করেছেন। মডেল ও অভিনেত্রী গ্যাব্রিয়েলা ওয়াইল্ড, যিনি ওই এলাকায় বসবাস করেন, বলেন, প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃতি ও পরিবেশবান্ধব ভাবমূর্তির সঙ্গে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের বিষয়টি সাংঘর্ষিক। তার প্রশ্ন, আশপাশের অনেক খামার যখন প্রকৃতিবান্ধব কৃষির দিকে এগোচ্ছে, তখন নিউটের এমন রাসায়নিক ব্যবহার কতটা প্রয়োজনীয়।

পানির উৎস নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের সন্দেহ, হোটেল কর্তৃপক্ষের খনন করা গভীর নলকূপের কারণে ব্রু নদীর কিছু অংশের পানিপ্রবাহ কমে গেছে। ওই নদীর একটি অংশের মালিক এবং সাইডার প্রস্তুতকারক অলিভার ডাউডিং এ বিষয়ে পরিবেশ সংস্থার মাধ্যমে নিউট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছেন। তিনি জানান, তার জমিতে আগে যেসব নিউট বা জলজ প্রাণী দেখা যেত, সেগুলোও এখন আর চোখে পড়ে না।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নিউট তাদের খাবার স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বলে প্রচার করলেও তাদের খামারগুলো জৈব কৃষি হিসেবে স্বীকৃত নয়। স্থানীয় বাসিন্দা জন সাইকস অভিযোগ করেন, আশপাশের একটি জৈব খামার নিউটের মালিকানায় যাওয়ার পর সেখানে আর আগের মতো জৈব পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে না। তার মতে, জমি কেনার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পুরো এলাকা এক ব্যক্তির বিশাল সম্পত্তিতে পরিণত হতে পারে।

তবে বেকারের বিনিয়োগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন এমন বাসিন্দাও রয়েছেন। তাদের মতে, বিনিয়োগের ফলে আগে অবহেলিত রেলস্টেশনটির উন্নতি হয়েছে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে এবং পর্যটক বাড়ায় স্থানীয় রেস্তোরাঁ ও পানশালাগুলোও উপকৃত হচ্ছে।

নিউট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জমি ও বাগানের প্রতি ভালোবাসা, পরিবেশের প্রতি সম্মান এবং সেই অভিজ্ঞতা আরও মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া তাদের দর্শনের অংশ। কৃষি, উদ্যান, বৃক্ষ পরিচর্যা, সংরক্ষণ, মৌমাছি পালন ও বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও তারা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং তারা স্থানীয় এলাকায় বসবাসকারী বা সেখান থেকে আসা ৬৫০ জনেরও বেশি মানুষকে কর্মসংস্থান দিয়েছে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এমকে

আরো পড়ুন

লন্ডন আদালতে ঐতিহাসিক রায়ঃ ব্রিটিশ সেনাদের সন্তান প্রমাণ করলেন কেনিয়ার সাত নাগরিক

নিউজ ডেস্ক

ইউকের ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের উপর অগ্রিম কমিশন পরিশোধের অভিযোগ

পূর্ব লন্ডনের এক ইমামের বিতর্কিত বক্তব্যঃ স্ত্রী অবাধ্য হলে ‘হালকাভাবে মারার’ পরামর্শ

নিউজ ডেস্ক