11.7 C
London
May 19, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রেক্সিট বিতর্কে নতুন মোড়, আবারও ইইউতে ফেরার দাবি উঠছে ব্রিটেনে

যুক্তরাজ্য আবারও ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ফিরতে পারে কি না—এ প্রশ্ন নতুন করে ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। ব্রেক্সিটের প্রায় এক দশক পর দেশটির অর্থনীতি, বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক প্রভাব নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের মধ্যেই পুনরায় ইইউতে যোগ দেওয়ার দাবি জোরালো হতে শুরু করেছে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারর নেতৃত্বের সমালোচনা করে পদত্যাগ করা সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং প্রকাশ্যে বলেছেন, ব্রেক্সিট ছিল “ভয়াবহ ভুল” এবং যুক্তরাজ্যের উচিত আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফেরার উদ্যোগ নেওয়া।

লেবার পার্টির এক সম্মেলনে তিনি বলেন, “ইইউ ছেড়ে যাওয়ার ফলে ব্রিটেন কম ধনী, কম শক্তিশালী এবং কম প্রভাবশালী হয়ে পড়েছে।” তার ভাষায়, ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ ইউরোপের সঙ্গেই জড়িত এবং একদিন দেশটি আবারও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হবে।

স্ট্রিটিং রাশিয়ার আগ্রাসন ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রসঙ্গ টেনে ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ করার ইঙ্গিতও দেন তিনি।

তবে লেবার পার্টির ভেতরেই এ বিষয়ে স্পষ্ট বিভক্তি দেখা দিয়েছে। ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম, যিনি অতীতে ইইউতে ফেরার পক্ষে মত দিয়েছিলেন, এবার কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, “ব্রেক্সিট ক্ষতিকর ছিল, কিন্তু এখন সেই পুরোনো বিতর্ক আবার শুরু করা ঠিক হবে না।”

বার্নহাম জানান, গণভোটে জনগণ যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে সেটিকে সম্মান করা প্রয়োজন। বিশেষ করে তিনি এমন একটি আসনে উপনির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছেন, যেখানে ২০১৬ সালের গণভোটে প্রায় ৬৫ শতাংশ ভোটার ইইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।

এদিকে সংস্কৃতি মন্ত্রী লিসা ন্যান্ডি স্ট্রিটিংয়ের বক্তব্যকে “অদ্ভুত” আখ্যা দিয়ে বলেন, “শুধু ইইউতে ফিরে গেলেই সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।”

লেবার এমপি ড্যান কার্ডেনও বলেন, শ্রমজীবী জনগণকে এটা বলা উচিত নয় যে তারা ব্রেক্সিটের সিদ্ধান্তে ভুল করেছিল।

অন্যদিকে কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি ব্যাডেনক দাবি করেছেন, ব্রেক্সিট বিতর্কে ফিরে যাওয়া প্রমাণ করে লেবার পার্টির দেশের জন্য সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই।

প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার অবশ্য পুনরায় ইইউতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি। তবে তিনি বলেছেন, বর্তমানে তার লক্ষ্য হচ্ছে যুক্তরাজ্যকে “ইইউর আরও কাছাকাছি” নেওয়া, কারণ সেটি দেশের জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন।

ব্রেক্সিটের ইতিহাস ও প্রভাবঃ

২০১৬ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত গণভোটে ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে ভোট দেন। ২০১৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ২০২০ সালে যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ত্যাগ করে।

ইউরেশিয়া গ্রুপের ইউরোপবিষয়ক বিশ্লেষক মুজতবা রহমান বলেন, ব্রেক্সিট ছিল যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন—উভয়ের জন্যই অত্যন্ত কঠিন ও বিভাজনমূলক প্রক্রিয়া।

ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক সংকটে পড়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরে বরিস জনসন “গেট ব্রেক্সিট ডান” স্লোগানে নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রেক্সিটের ফলে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্যাথরিন বার্নার্ড বলেন, ব্রেক্সিট-পরবর্তী জটিল বাণিজ্যিক কাগজপত্র ও নিয়মের কারণে ছোট ব্যবসায়ীরা ইউরোপীয় বাজারে টিকে থাকতে পারছেন না।

থিংক ট্যাংক ইউকে ইন আ চেঞ্জিং ইউরোপর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে আমদানি-রপ্তানি প্রায় ১৫ শতাংশ কমে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ব্রিটিশ বাজেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা।

আবার ইইউতে ফেরা কতটা সম্ভব?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাজ্যের পুনরায় ইইউতে যোগ দেওয়া সম্ভব হলেও সেটি হবে দীর্ঘ ও জটিল রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিটি সদস্য দেশের সম্মতি প্রয়োজন হবে।
অধ্যাপক ক্যাথরিন বার্নার্ডের মতে, ফ্রান্সের মতো কিছু দেশ আবার গণভোট আয়োজন করেও যুক্তরাজ্যের পুনঃঅন্তর্ভুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

তবে ইউরোপের কিছু নেতা ইতোমধ্যে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। জার্মান আইনপ্রণেতা ক্নুট আব্রাহাম বলেছেন, “বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের সময়ে ব্রিটেনকে ফিরে পাওয়া ইউরোপের জন্য লাভজনক হবে।”
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও জানিয়েছেন, স্পেন “অবশ্যই” ব্রিটেনের পুনরায় যোগদানের পক্ষে থাকবে।

এদিকে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত ইউগভর এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক আবার ইইউতে যোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ব্রেক্সিট নিয়ে হতাশা বাড়লেও এখনো ব্রিটিশ সমাজে বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ফলে যুক্তরাজ্যের পুনরায় ইইউতে ফেরা রাজনৈতিকভাবে সহজ হবে না বলেই মনে করছেন তারা।

সূত্রঃ টাইম

এম.কে

আরো পড়ুন

ইউক্রেনে পুতিন যুদ্ধাপরাধ করেছেন: বরিস জনসন

ডিপোজিট মুক্ত ১০০% মর্গেজ

নিউজ ডেস্ক

সপ্তাহে ৩ দিন ছুটির পথে হাঁটছে ২০০ ব্রিটিশ কোম্পানি