20.5 C
London
June 19, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

আশ্রয়প্রার্থীদের আপিলে বিচারকদের ক্ষমতা বাতিলের টোরিদের প্রস্তাবে তীব্র সমালোচনা

আশ্রয়প্রার্থীদের বহিষ্কারের বিরুদ্ধে করা আপিলে বিচারকদের ক্ষমতা বাতিল এবং অভিবাসন ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার কনজারভেটিভ পার্টির প্রস্তাব যুক্তরাজ্যে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন, শরণার্থী অধিকারকর্মী এবং আইনজীবীরা এই পরিকল্পনাকে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির ওপর আঘাত হিসেবে অভিহিত করেছেন।

মঙ্গলবার এক বক্তব্যে কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া স্বরাষ্ট্র সচিব ক্রিস ফিল্প ঘোষণা দেন, দলটি ক্ষমতায় এলে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ (ইসিএইচআর) থেকে বেরিয়ে আসবে এবং বর্তমানে আশ্রয়প্রার্থীদের বহিষ্কারের বিরুদ্ধে আপিলের জন্য ব্যবহৃত বিচারিক ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থা বাতিল করবে।

ফিল্পের প্রস্তাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে অভিবাসনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গ্রহণ করবে এবং আবেদনকারীরা কেবল মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত আপিলের সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে সব ধরনের অভিবাসন মামলায় সরকারি অর্থায়নে আইনি সহায়তা বা লিগ্যাল এইড সুবিধাও বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এই প্রস্তাবের কঠোর সমালোচনা করে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করা মানবাধিকার সংস্থা ‘ফ্রিডম ফ্রম টর্চার’-এর আশ্রয়বিষয়ক অ্যাডভোকেসি প্রধান সাইল রেনল্ডস বলেন, “এটি ন্যায়বিচার ও আইনের দৃষ্টিতে সমতার ধারণার ওপর সরাসরি আক্রমণ।”

তিনি বলেন, “নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিসহ যারা আন্তর্জাতিক সুরক্ষা চাইছেন, তাদের ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি প্রাণঘাতী হতে পারে। স্বাধীন আপিল প্রক্রিয়া এবং কার্যকর আইনি পরামর্শ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যা মানুষকে আবারও নির্যাতনকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার মতো ভুল সিদ্ধান্ত থেকে রক্ষা করে।”

শরণার্থী বিষয়ক সংগঠন রিফিউজি কাউন্সিলের বহিঃবিষয়ক পরিচালক ইমরান হুসেইন বলেন, এই পরিকল্পনা গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেবে।

তার ভাষায়, “কোনো ব্রিটিশ সরকারেরই নিজের সিদ্ধান্তের বিচার নিজেই করার সুযোগ থাকা উচিত নয়, বিশেষ করে যখন মানুষ সরকারের বেআইনি কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলে।”

এদিকে, ল সোসাইটি অব ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলসের সভাপতি মার্ক ইভানস বলেন, অভিবাসন ট্রাইব্যুনাল বাতিল করা হলে বিচারব্যবস্থার স্বাধীন তদারকির সুযোগ বিলুপ্ত হবে।

তিনি বলেন, “আপিলের অধিকার আমাদের বিচারব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি এবং নিরাপত্তা খোঁজারত মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচারকরা কেবল বিদ্যমান আইনের মধ্যেই কাজ করেন। তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তোলা ক্ষতিকর এবং অন্যায্য।”

অভিবাসন আইনজীবীদের সংগঠন ইমিগ্রেশন ল’ প্র্যাকটিশনার্স অ্যাসোসিয়েশন (আইএলপিএ) অভিযোগ করেছে, কনজারভেটিভ নেতারা আইনজীবী ও বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে বৈরিতার পরিবেশ তৈরি করছেন।

অন্যদিকে, ডানপন্থী থিংকট্যাঙ্ক পলিসি এক্সচেঞ্জে দেওয়া বক্তব্যে ক্রিস ফিল্প দাবি করেন, যুক্তরাজ্যের বর্তমান অভিবাসন ব্যবস্থায় বিচারকদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, “অভিবাসন ট্রাইব্যুনালের কিছু সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের যুক্তিবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বর্তমান ব্যবস্থাই এসব সিদ্ধান্তকে সম্ভব করে তুলছে।”

ফিল্প একাধিক বিতর্কিত মামলার উদাহরণও তুলে ধরেন। এর মধ্যে ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের জন্য তৈরি একটি স্কিমের আওতায় আবেদন করা এক ফিলিস্তিনি পরিবারকে যুক্তরাজ্যে বসবাসের অনুমতি দেওয়া এবং ৫০টি অপরাধের রেকর্ড থাকা এক আলবেনীয় নাগরিককে বহিষ্কার না করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন তিনি।

কনজারভেটিভ পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছোট নৌকায় বা ট্রাকের পেছনে লুকিয়ে অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশকারী অধিকাংশ ব্যক্তিকে আশ্রয়ের আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হবে না।

তবে ফিল্প স্পষ্ট করেন যে, যদি কোনো ব্যক্তির নিজ দেশে ফিরে গেলে জীবন বা স্বাধীনতার জন্য প্রকৃত ও গুরুতর ঝুঁকি থাকে, তাহলে স্বরাষ্ট্র সচিব তাকে রুয়ান্ডার মতো কোনো নিরাপদ তৃতীয় দেশে পাঠানোর ক্ষমতা রাখবেন।

তিনি বলেন, “আমি আশা করি, অবৈধভাবে আগত অধিকাংশ অভিবাসীকেই তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।”

বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ইতোমধ্যে দুই স্তরের ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থার পরিবর্তে দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে একটি একক স্বাধীন আপিল সংস্থা গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন।

অন্যদিকে, রিফর্ম ইউকে আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। দলটি এমন একটি আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছে, যার মাধ্যমে অবৈধ পথে যুক্তরাজ্যে প্রবেশকারী ব্যক্তিদের আশ্রয় আবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অভিবাসন ট্রাইব্যুনাল কিংবা উচ্চ আদালত—কোনো প্রতিষ্ঠানই বিবেচনা করতে পারবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন ইস্যুকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় আন্তর্জাতিক আইন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আশ্রয়প্রার্থীদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি উপেক্ষা করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

লন্ডনে একটি কাঁঠালের দাম ১৯ হাজার টাকা!

যুক্তরাজ্যে সুপ্রিম কোর্ট রায়ের পর লেবার উইমেন্স কনফারেন্সে ট্রান্স নারীদের মূল অধিবেশনে নিষেধাজ্ঞা

দাম না বাড়ালে ডিম উৎপাদন বন্ধের হুমকি!

অনলাইন ডেস্ক