স্কটল্যান্ডের ডানব্লেনের একটি ভারতীয় রেস্তোরাঁয় ম্যানেজারকে ভদ্রভাবে কথা বলার অনুরোধ করার পর চাকরি হারানো এক ওয়েটারকে মোট ৭ হাজার ১৮৫ পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এমপ্লয়মেন্ট ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনাল রায়ে ঘটনাটিকে অন্যায্য বরখাস্ত হিসেবে বিবেচনা করেছে।
মামলার বাদী আসিফ আব্বাস ডানব্লেনের ইন্ডিয়া গেট তান্দুরি রেস্তোরাঁয়, ওয়েটার হিসেবে কাজ করতেন। তিনি ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে সেখানে কর্মরত ছিলেন। ২০২৫ সালের ২২ আগস্ট একটি কাজকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে ম্যানেজার রাজিন্দর সিংয়ের বিরোধের সূত্রপাত হয়।
ট্রাইব্যুনালের নথি অনুযায়ী, ওই দিন সন্ধ্যা প্রায় ৭টার দিকে আব্বাস একটি টেবিল থেকে ব্যবহৃত প্লেট ও কাটলারি নিয়ে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিলেন। রেস্তোরাঁর স্বাভাবিক কাজের অংশ হিসেবেই ওয়েটাররা ব্যবহৃত প্লেট ও কাটলারি রান্নাঘরের ধোয়ার জায়গার কাছে নিয়ে যেতেন। কিন্তু ম্যানেজার সিং তাকে এ নিয়ে চিৎকার করে বলেন, ছুরি ও চামচ সেখানে রেখে দিতে তিনি আগেই নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এর জবাবে আব্বাস জানান, ম্যানেজার চাইলে তিনি সেভাবেই কাজ করবেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি তাকে একটু ‘ভদ্রভাবে’ জানানো যেতে পারে। এরপর ম্যানেজার তাকে বলেন, “তোমাকে চলে যেতে হবে।”
প্রথমে আব্বাস বিষয়টিকে সাধারণ কর্মক্ষেত্রের একটি তর্ক হিসেবে মনে করেছিলেন। তাই ওই ঘটনার পরও তিনি কাজ চালিয়ে যান। প্রায় রাত ৯টার দিকে ম্যানেজার তাকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি এখনো সেখানে কেন আছেন। এরপর আবার তাকে বলা হয়, কাজ শেষ করে চলে যেতে হবে এবং তাকে আর প্রয়োজন নেই।
আব্বাসের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ওই ঘটনায় অপমানিত বোধ করেন। পরে তিনি স্টার্লিংয়ের সিটিজেন্স অ্যাডভাইস ব্যুরোতে পরামর্শ নেন এবং রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানান যে তাকে কোনো কারণ না দেখিয়ে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি লিখিত চাকরির চুক্তি, বরখাস্তের কারণ, নোটিশ পে ও অন্যান্য কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত তথ্যও দাবি করেন।
অন্যদিকে রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ দাবি করে, আব্বাসকে বরখাস্ত করা হয়নি; বরং ম্যানেজারের সঙ্গে বিরোধের পর তিনি নিজেই কর্মস্থল ছেড়ে আর কাজে ফেরেননি। ট্রাইব্যুনাল অবশ্য এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি।
এমপ্লয়মেন্ট জাজ রবার্ট ফিলিপসের সিদ্ধান্তে বলা হয়, ম্যানেজারের পরবর্তী বক্তব্য—‘তোমাকে চলে যেতে হবে’, ‘কাজ শেষ করো’, ‘আমাদের তোমাকে আর প্রয়োজন নেই’—এসব কথা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট ছিল। একজন যুক্তিসঙ্গত পর্যবেক্ষকও এটিকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করতেন।
ট্রাইব্যুনাল আরও জানায়, নিয়োগকর্তা আব্বাসকে বরখাস্ত করার কোনো ন্যায্য কারণ উপস্থাপন করতে পারেনি এবং কোনো ন্যায্য বরখাস্ত প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হয়নি। ফলে আইনগতভাবে এটি অন্যায্য বরখাস্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
শুধু অন্যায্য বরখাস্তের বিষয়ই নয়, আব্বাসের চাকরির অন্যান্য শর্ত নিয়েও ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। তিনি প্রায় তিন বছর কাজ করলেও তাকে যথাযথ লিখিত চাকরির চুক্তি দেওয়া হয়নি এবং তার অর্জিত কিন্তু নেওয়া হয়নি এমন ছুটির অর্থও পুরোপুরি দেওয়া হয়নি।
রায়ের হিসাব অনুযায়ী, আব্বাসকে মোট ৭,১৮৫.৪৬ পাউন্ড দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল ৭৩২.৬০ পাউন্ড বেসিক অ্যাওয়ার্ড, ২,২৬৯ পাউন্ড ক্ষতিপূরণ, ২,৭১৮.৬৬ পাউন্ড জমে থাকা ছুটির অর্থ, ৪৮৮.৪০ পাউন্ড দুই সপ্তাহের নোটিশ পে এবং লিখিত চাকরির শর্ত না দেওয়ার জন্য ৯৭৬.৮০ পাউন্ড।
তবে আব্বাসের সব দাবি ট্রাইব্যুনাল গ্রহণ করেনি। পেনশন না দেওয়া এবং জাতীয় ন্যূনতম মজুরি না পাওয়ার অভিযোগে তিনি সফল হননি।
স্কটল্যান্ডের এই মামলাটি ২০২৬ সালের এপ্রিলে শুনানি হয়। পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। স্থানীয় স্কটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য কুরিয়ারও মামলাটি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট, দ্য কুরিয়ার
এম.কে

