TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

ভয়ের দেশে পরিণত সুইডেনঃ কঠোর অভিবাসন নীতিতে বিপর্যস্ত হাজারো অভিবাসী পরিবার

সুইডেনে অভিবাসন ও আশ্রয় নীতির সাম্প্রতিক কড়াকড়িতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেই পরিবারগুলো, যারা বছরের পর বছর দেশটিতে বসবাস করে কাজ করেছেন, ভাষা শিখেছেন এবং সমাজে একীভূত হয়েছেন। নতুন নীতির ফলে হাজারো মানুষ এখন বহিষ্কারের আশঙ্কায় চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

 

উজবেকিস্তান থেকে আসা তিন সন্তানের মা সোফিয়ে তার জীবনের বড় একটি সময় সুইডেনে কাটিয়েছেন। ২০০৮ সালে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে আসার পর তিনি চাকরি করেছেন, সুইডিশ ভাষা শিখেছেন এবং তার সন্তানরা সুইডিশ শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেই বড় হয়েছে।

তার ছোট সন্তান সুইডেনেই জন্মেছে। তবে একাধিকবার আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তিনি কাজের অধিকার হারান এবং এখন বহিষ্কারের ঝুঁকিতে রয়েছেন। গত দুই বছর ধরে তিনি ও তার সন্তানরা স্টকহোমের আরলান্ডা বিমানবন্দরের কাছের একটি আশ্রয় ফেরত কেন্দ্রে বসবাস করছেন।

এই অনিশ্চয়তা তার মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। দীর্ঘদিন ধরে ঘুমহীনতা, ক্ষুধামন্দা ও বমিতে ভুগছেন তিনি। তার ভাষায়, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এতটাই তীব্র যে সন্তানদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলার শক্তিও তার আর নেই।

সুইডেন সরকার বলছে, তারা আশ্রয়প্রার্থী গ্রহণের বদলে শ্রমভিত্তিক অভিবাসনে বেশি গুরুত্ব দিতে চায়। কট্টর ডানপন্থী সুইডেন ডেমোক্র্যাটসের সমর্থনে পরিচালিত বর্তমান সরকার অভিবাসন নীতি কঠোর করেছে এবং দাবি করছে—আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা কমলে একীভূতকরণ সহজ হবে। সরকারিভাবে জানানো হয়েছে, ১৯৮৫ সালের পর বর্তমানে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা সর্বনিম্ন।

তবে বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, বহু মানুষ যারা সুইডিশ সমাজে প্রতিষ্ঠিত, চাকরির বাজারে সক্রিয় এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ দেশটির সঙ্গে যুক্ত—তারাই এখন বহিষ্কারের মুখে পড়ছেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আশ্রয় আবেদন বাতিল হলে কেউ আর কাজের অনুমতির জন্য আবেদন করতে পারবে না, এমনকি আগে চাকরি থাকলেও ভিসা নবায়নের সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় ৪,৭০০ মানুষ সরাসরি বহিষ্কারের ঝুঁকিতে পড়েছেন।

এছাড়া নাগরিকত্ব পাওয়ার শর্ত কঠোর করা হয়েছে, পরিবার পুনর্মিলনের নিয়মে কড়াকড়ি এসেছে এবং কোনো অপরাধে জড়ালে অ-নাগরিকদের বসবাসের অধিকার বাতিল করা হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অপরাধজনিত কারণে ৪৪০ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

ফেরত কেন্দ্রগুলোতে জীবনযাপনও অত্যন্ত কঠিন। অনেক কেন্দ্র শহর থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ায় যাতায়াত ব্যয়বহুল ও জটিল। অনেক পরিবার দিনে মাত্র কয়েক ক্রোনা নিয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছে। শিশু ও এলজিবিটিকিউ আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য এসব কেন্দ্র মানসিকভাবে আরও অনিরাপদ হয়ে উঠেছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করছে।

স্টকহোমভিত্তিক সহায়তা সংস্থার কাউন্সেলর ন্যানি স্কোল্ড জানান, বহিষ্কারের আদেশ পাওয়া মানুষদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক চরমে পৌঁছেছে। অনেকেই প্রশ্ন করছেন—সব নিয়ম মেনে কাজ করা, ভাষা শেখা এবং সমাজে একীভূত হওয়াও যদি যথেষ্ট না হয়, তবে তারা নিজেদের মূল্য কীভাবে প্রমাণ করবেন।
ইরাক থেকে কাজের ভিসায় আসা থামের ও ফাতেনের পরিবারও একই বাস্তবতার মুখোমুখি।

তাদের সন্তানদের একজন সুইডেনেই জন্মেছে। কিন্তু ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া ও আশ্রয় আবেদন বাতিল হওয়ায় তারা এখন বহিষ্কারের ঝুঁকিতে। থামের জানান, নিজ দেশে ফিরলে তার সন্তানদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে, তবু সুইডেনে থেকে কাজ করার সুযোগ তিনি পাচ্ছেন না।

সুইডিশ মাইগ্রেশন এজেন্সি বলছে, তারা কেন্দ্রগুলোকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছে এবং শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর বিষয়ে বিশেষ বিবেচনা নেওয়া হচ্ছে। তবে মানবাধিকারকর্মীদের মতে, বাস্তব চিত্র ভিন্ন—এটি এখন আর আগের ‘শরণার্থীবান্ধব’ সুইডেন নয়, বরং ভয়ের এক নতুন বাস্তবতা।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের স্ত্রীকে ‘পুরুষ’ হিসেবে অভিহিত, হলো মামলা

দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব হারাচ্ছে ভারতঃ প্রতিবেশীরা ঝুঁকছে বহুমুখী কূটনীতির পথে

মনিপুরে ঢুকছে মায়ানমারের অস্ত্র, ভারত অশান্তে সন্দেহের তীর চায়নার দিকে!