তেরো বছর আগে দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ডের স্মৃতি ফিরিয়ে এনে ভারতের বিহার রাজ্যের বেগুসরাই জেলায় ঘটেছে আরেকটি নৃশংস গণধর্ষণের ঘটনা। চার সন্তানের মা ২৮ বছর বয়সী এক নারী (ছদ্মনাম সোমা) নিজের বাড়ির শৌচাগারে পাঁচজন পুরুষের দ্বারা গণধর্ষিত হয়েছেন। নির্যাতনের সময় তার যৌনাঙ্গে বিভিন্ন বস্তুসহ একটি গুলির খোসা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
১১ জুন রাতে বেগুসরাই জেলার একটি গ্রামের এক কামরার ঘরের বাইরের শৌচাগারে (যেখানে কোনো দরজা নেই, শুধু পর্দা ঝোলানো) সোমা যখন টয়লেটে গিয়েছিলেন, তখন পাঁচজন ব্যক্তি জোর করে ঢুকে পড়ে। তারা তার কাপড় খুলে ফেলে মুখ ও হাত বেঁধে ফেলেন। বাধা দিতে গেলে ব্লেড দিয়ে বুকে আঘাত করে ধর্ষণ করেন এবং যৌনাঙ্গে বিভিন্ন বস্তু ঢুকিয়ে নির্যাতন চালান।
সোমা জানান, তার স্বামী প্রথমে গোঙানির শব্দকে বিড়ালের ডাক ভেবেছিলেন। পরে সন্দেহ হলে এগিয়ে এসে দেখেন বাড়ির দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। প্রতিবেশীর সাহায্যে দরজা খুলে সোমার অবস্থা দেখে সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
পুলিশি অবহেলা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ব্যর্থতা
সোমার স্বামী (ই-রিকশা চালক) অচেতন স্ত্রীকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের থানায় নিয়ে গেলে পুলিশ প্রথমে অভিযোগ নিতে অস্বীকার করে এবং ডাক্তার দেখানোর পরামর্শ দেয়। পরে এই অবহেলার দায়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাজীব কুমারকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
চিকিৎসা সেবাতেও একই উদাসীনতা দেখা গেছে। কাছের একটি বেসরকারি ক্লিনিক তাদের ফিরিয়ে দেয়। সরকারি কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে জেলা হাসপাতালে রেফার করা হয়। সোমা জানান, হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা অপ্রতুল ছিল।
১২ জুন জ্ঞান ফেরার পর তিনি চিকিৎসকদের গণধর্ষণের কথা জানালেও পরবর্তীতে আবার অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে গ্রামের এক ধাত্রীর সতর্কতায় জানা যায় যে তার শরীরের ভেতর বস্তু রয়ে গেছে। ১৮ জুন তার যৌনাঙ্গ থেকে গুলির খোসা বের হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরে আরও বস্তু বের করে এবং তার অবস্থা এখন স্থিতিশীল।
বেগুসরাইয়ের পুলিশ সুপার মণীশ জানিয়েছেন, মেডিকেল রিপোর্টে যৌন নির্যাতন স্পষ্ট। তিনজনের নামসহ দুজন অজ্ঞাত অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে পূর্বে অপরাধের ইতিহাস রয়েছে। বিশেষ তদন্তকারী দল বাকিদের খুঁজছে।
নির্ভয়া কাণ্ডের সঙ্গে তুলনা
এই ঘটনাকে ২০১২ সালের দিল্লির নির্ভয়া গণধর্ষণের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। নির্ভয়া কাণ্ডের পর কঠোর ধর্ষণ-বিরোধী আইন প্রণয়ন হয় এবং মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত হয়। কিন্তু সমাজকর্মীরা বলছেন, বাস্তবে খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।
ধর্ষণ-বিরোধী আন্দোলনকর্মী ইয়োগিতা ভায়ানা বলেন, “আমরা কোনো শিক্ষাই নিইনি। অধিকাংশ ঘটনাই নথিভুক্ত হয় না। সমাজ এখন এতটাই অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছে যে চরম বর্বরতার ঘটনাতেও খুব একটা প্রতিক্রিয়া হয় না। মৃত্যুদণ্ডের ভয়ও তৈরি হয়নি।”
বেগুসরাই ভারতের অন্যতম পিছিয়ে পড়া জেলা। সোমা এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি সন্তানদের কাছে ফিরতে চান। তার স্বামী ও সন্তানরা গ্রামের আত্মীয়দের কাছে আছেন।
ভারতে প্রতি বছর ৩০ হাজারের বেশি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশি সাড়া, চিকিৎসা ব্যবস্থা ও সামাজিক সচেতনতার বড় ধরনের উন্নতি না হলে এমন ঘটনা বন্ধ করা কঠিন।
সোমার ঘটনা ফের মনে করিয়ে দিল, ভারতে যৌন নির্যাতনের শিকার নারীদের—বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের—শুধু অপরাধীদের হাতেই নয়, প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতার শিকারও হতে হয়। তদন্ত চলছে এবং দেশজুড়ে এ ঘটনার নিন্দা অব্যাহত রয়েছে।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
এম.কে

