11.4 C
London
September 9, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্য–ইসরায়েল সম্পর্কে চরম অবনতিঃ আর্জেন্টিনার পক্ষে ফকল্যান্ড দাবি, ব্রিটেনকে স্যাংশন দেয়ার আহ্বান

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোর বিরুদ্ধে ব্রিটেনের কঠোর বাণিজ্যিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। ব্রিটিশ সরকার পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ এবং বসতি সম্প্রসারণে অর্থায়ন, নির্মাণ, অবকাঠামো, আবাসন ও বিজ্ঞাপনসংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে নতুন ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ব্রিটেনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন।

বেন-গভির ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে আর্জেন্টিনার ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রিটেন ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ‘দখল’ করে রেখেছে এবং সেখানে তেলসম্পদ আহরণ করছে।

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের সার্বভৌমত্ব বিরোধ রয়েছে। ১৯৮২ সালে এ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধও হয়েছিল। ব্রিটেন বর্তমানে দ্বীপগুলো পরিচালনা করছে, অন্যদিকে আর্জেন্টিনা এগুলোকে ‘মালভিনাস’ নামে উল্লেখ করে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে।

ইসরায়েলি মন্ত্রীর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড পার্লামেন্টে ইসরায়েলি বসতি নিয়ে সরকারের নতুন নীতি ঘোষণা করেছেন। ব্রিটেন জানিয়েছে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলো থেকে সব ধরনের পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা হবে। বসতিগুলোর অর্থায়ন, নির্মাণ, অবকাঠামো, জমি-বাড়ি ও বিজ্ঞাপন কার্যক্রমে সহায়তাকারী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ব্রিটিশ সরকারের দাবি, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা দুই রাষ্ট্রভিত্তিক শান্তি সমাধানের সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ব্রিটেনসহ ১২টি দেশ ৮ সেপ্টেম্বর যৌথ বিবৃতিতে বসতি থেকে পণ্য বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা বা এ ধরনের ব্যবস্থা বিবেচনার কথা জানিয়েছে।

এড মিলিব্যান্ড পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলি সরকারের নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ব্রিটেনের পদক্ষেপ ইসরায়েলি জনগণের বিরুদ্ধে নয়; বরং অধিকৃত ভূখণ্ডে বসতি সম্প্রসারণ ও তা টিকিয়ে রাখার কার্যক্রমের বিরুদ্ধে। ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য হলো ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় ভূখণ্ডগত সম্ভাবনা এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান রক্ষা করা।

বিশেষ করে পশ্চিম তীরের ‘ই১’ এলাকায় নতুন বসতি প্রকল্প নিয়ে ব্রিটেনের উদ্বেগ তীব্র হয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের মতে, ওই এলাকায় বসতি সম্প্রসারণ পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক সংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত করে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে দুর্বল করতে পারে।

ব্রিটেনের সিদ্ধান্তের পর ইসরায়েলও পাল্টা কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে। ইসরায়েল জানিয়েছে, পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং কয়েকজন ব্রিটিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হবে। ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার এ পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন।

এদিকে বেন-গভিরের পাশাপাশি ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচও ব্রিটেনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে ইসরায়েল থেকে বহিষ্কারের আহ্বান জানিয়েছেন এবং ব্রিটিশ সরকারের নীতিকে ইসরায়েলবিরোধী বলে আক্রমণ করেছেন।

ফকল্যান্ড ইস্যুটি নতুন করে সামনে আসার পেছনে অর্থনৈতিক কারণও রয়েছে। দ্বীপপুঞ্জের আশপাশে বিপুল তেলসম্পদের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ‘সি লায়ন’ তেলক্ষেত্র বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি ২০১০ সালে আবিষ্কৃত হয় এবং ২০২৮ সাল থেকে উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তেলক্ষেত্রটিতে আনুমানিক ১৭০ কোটি ব্যারেল তেল মজুত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

এই তেল প্রকল্পকে ঘিরেই আর্জেন্টিনা ইতোমধ্যে ইসরায়েলি জ্বালানি কোম্পানি নাভিটাস পেট্রোলিয়াম ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে। আর্জেন্টিনার সরকার অভিযোগ করেছে, ব্রিটিশ লাইসেন্সের ভিত্তিতে ফকল্যান্ডের আশপাশে তেল অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালনা করে কোম্পানিটি আর্জেন্টিনার আইন লঙ্ঘন করেছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, আর্জেন্টিনা নাভিটাস পেট্রোলিয়াম ও এর নির্বাহীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেছে। নাভিটাস ৬৫ শতাংশ অংশীদারিত্ব নিয়ে ‘সি লায়ন’ প্রকল্প পরিচালনা করছে, আর যুক্তরাজ্যভিত্তিক রকহপার এনার্জির অংশীদারিত্ব ৩৫ শতাংশ। প্রকল্পটি উৎপাদনে গেলে দৈনিক প্রায় ৫০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।

ফকল্যান্ড নিয়ে ইসরায়েলের অবস্থান আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধে ইসরায়েল আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তাকে অস্ত্র সরবরাহ করেছিল। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর প্রকাশ্যে আর্জেন্টিনার দাবির প্রতি সমর্থন জানানো ব্রিটিশ-ইসরায়েল সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশেষ রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করছে।

এর আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহুও ফকল্যান্ড ইস্যুতে আর্জেন্টিনার দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। তিনি ব্রিটেনের ফিলিস্তিন নীতির সমালোচনা করে ফকল্যান্ড বিষয়ে ইসরায়েলের অবস্থান পুনর্বিবেচনার কথা বলেছিলেন।

অন্যদিকে ব্রিটেন বলছে, পশ্চিম তীরের বসতি নিয়ে তাদের নতুন পদক্ষেপ বৃহত্তর আন্তর্জাতিক অবস্থানের অংশ। ব্রিটেন, ফ্রান্স, কানাডাসহ একাধিক দেশ মনে করছে, বসতি সম্প্রসারণ এবং সহিংসতা বন্ধ না হলে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

ফলে একটি আঞ্চলিক ইস্যু থেকে শুরু হওয়া উত্তেজনা এখন একাধিক কূটনৈতিক ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়ছে। একদিকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতির বিরুদ্ধে ব্রিটেন ও কয়েকটি মিত্র দেশের নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে ইসরায়েলের পাল্টা কূটনৈতিক ব্যবস্থা এবং ফকল্যান্ড নিয়ে আর্জেন্টিনার দাবির প্রতি ইসরায়েলি কট্টরপন্থী মন্ত্রীর প্রকাশ্য সমর্থন—সব মিলিয়ে ব্রিটেন-ইসরায়েল সম্পর্ক নতুন এক উত্তেজনাপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।

তবু ব্রিটেনের বিরুদ্ধে এমন প্রকাশ্য হুমকি দুই দেশের মধ্যকার দ্রুত অবনতিশীল সম্পর্কের মাত্রা স্পষ্ট করছে। বিশেষ করে পশ্চিম তীরের বসতি, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি এবং ইসরায়েলি সরকারের নীতিকে ঘিরে লন্ডনের অবস্থান যত কঠোর হচ্ছে, ততই পাল্টা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

এম.কে

আরো পড়ুন

ডিডব্লিউপি গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত রাখতে অতি জরুরি ৬টি পরামর্শ

অনলাইন ডেস্ক

বর্ণবৈষম্য রোধে যুক্তরাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন প্রয়োজনঃ মুসলিম নেতৃবৃন্দ

ইমিগ্র্যান্ট সংখ্যা কমছে, তবু ব্রিটেনে অভিবাসন ইস্যু এখনো রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু