ছেলের গুরুত্বপূর্ণ এ-লেভেল পরীক্ষার মাত্র দুই দিন আগে লন্ডনের আবাসন থেকে স্কটল্যান্ডে স্থানান্তরের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য সরকারের দ্বারস্থ হয়েছে এক আশ্রয়প্রার্থী পরিবার। পরিবারের দাবি, আকস্মিক এই স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে এবং ছেলের শিক্ষাজীবনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
পরিবারটি গত প্রায় চার বছর ধরে লন্ডনের বিভিন্ন হোটেলে স্থানান্তরিত হয়ে বসবাস করছে। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এক হোটেল থেকে অন্য হোটেলে সরিয়ে নেওয়ার পর এবার হোম অফিস তাদের লন্ডন ছেড়ে স্কটল্যান্ডে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের জন্য পরিবারটিকে মাত্র দুই সপ্তাহের নোটিশ দেওয়া হয়।
পরিবারটির পক্ষে কাজ করা লিউইশামের শরণার্থী সহায়তা সংগঠন ‘অ্যাকশন ফর রিফিউজিস ইন লিউইশাম’ জানিয়েছে, পরিবারের বড় ছেলে পড়াশোনা শেষ না করা পর্যন্ত তাদের লন্ডনেই থাকার সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আগে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই অবস্থানের পরিবর্তে হঠাৎ করে স্কটল্যান্ডে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয় স্থানান্তরের নির্ধারিত সময় নিয়ে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছেলেটির প্রথম এ-লেভেল পরীক্ষার মাত্র দুই দিন আগে পরিবারটিকে স্কটল্যান্ডে পাঠানোর কথা ছিল। এমন পরিস্থিতিতে নতুন শহরে স্থানান্তর, আবাসন পরিবর্তন এবং পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়।
পরিবারটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একাধিকবার আপিল করলেও সেগুলো ব্যর্থ হয়। এরপর তাদের আইনজীবীরা আদালতের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা আদায় করেন। এর ফলে আপাতত পরিবারটিকে লন্ডন থেকে স্কটল্যান্ডে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া আটকে যায়।
এরপর পরিবারটি সরকারের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জ শুরু করে। তাদের আইনজীবীদের মূল দাবি, পরিবারটিকে এমন সময়ে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যখন সন্তানের শিক্ষাজীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায় চলছে। ফলে সিদ্ধান্তটি তাদের মানবাধিকার সুরক্ষার প্রশ্নও সামনে এনেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বরাষ্ট্র দপ্তর লন্ডনের ভেতরে বিকল্প কয়েকটি হোটেলে পরিবারটিকে থাকার প্রস্তাব দেয়। তবে শরণার্থী অধিকারকর্মীদের দাবি, প্রস্তাবিত আবাসনগুলো পরিবারের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের মতে, শুধু লন্ডনের মধ্যে অন্য কোনো হোটেলে স্থানান্তরের প্রস্তাব দিলেই পরিবারের স্থিতিশীলতা, শিক্ষার ধারাবাহিকতা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টি নিশ্চিত হয় না।
এদিকে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ব্যবহৃত হোটেল বন্ধের কার্যক্রম জোরদার করেছে লেবার সরকার। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একের পর এক অভিবাসী আবাসন হোটেল বন্ধ করা হচ্ছে। বর্তমানে ১৭০টিরও কম এমন হোটেল চালু রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শরণার্থী সহায়তা সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ক্লোই হোয়াইট সরকারের এই দ্রুতগতির হোটেল বন্ধের নীতির সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, স্বরাষ্ট্র দপ্তরের বর্তমান ব্যবস্থাপনার ফলে এমন অনেক মানুষকে তাদের পরিচিত এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে তারা প্রয়োজনীয় সহায়তা, সামাজিক যোগাযোগ ও অন্যান্য সহযোগিতা পেয়ে আসছিলেন।
হোয়াইটের ভাষায়, মানুষকে এমন এলাকা থেকে সরিয়ে নতুন স্থানে পাঠানো হচ্ছে, যেখানে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার অবকাঠামো সীমিত। এতে বিশেষ করে শিশু, শিক্ষার্থী এবং দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট এলাকার সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে পারে।
এখন পরিবারটিকে তাদের উচ্চ আদালতের চ্যালেঞ্জ এগিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ফলে আদালতে সরকারের আবাসন ও স্থানান্তর নীতির পাশাপাশি ওই পরিবারের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি, সন্তানের শিক্ষা এবং মানবাধিকারসংক্রান্ত বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই ঘটনা যুক্তরাজ্য সরকারের অভিবাসী হোটেল বন্ধের নীতি এবং আশ্রয়প্রার্থীদের স্থানান্তরের ক্ষেত্রে মানবিক ও শিক্ষাগত বিষয়গুলো কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে—তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপরই এখন নির্ভর করছে পরিবারটির লন্ডনে থাকার সুযোগ এবং তাদের ছেলের পড়াশোনা অব্যাহত রাখার ভবিষ্যৎ।
সূত্রঃ ডেইলি এক্সপ্রেস
এম.কে

