স্কটল্যান্ডে বৈধভাবে বসবাস ও কর্মরত এক অন্তঃসত্ত্বা কেয়ার কর্মী যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো ‘দেশে ফিরে যান’ চিঠির কারণে চরম উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তার আশঙ্কা, নতুন অভিবাসন নীতির কঠোর প্রয়োগের ফলে সন্তান জন্মের আগেই তাকে স্বামী ও সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হতে পারে।
৩৬ বছর বয়সী সাচিন্থা ওয়ার্নাকুলাসুরিয়া বর্তমানে স্কটল্যান্ডে কেয়ার কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। তার কর্মভিত্তিক ভিসা বৈধ এবং তিনি নিয়োগকর্তার স্পন্সরশিপের আওতায় রয়েছেন। তার স্বামী ইন্ডিকা কুমারা এবং ছয় বছর বয়সী কন্যা হেইলি নির্ভরশীল সদস্য হিসেবে যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে বসবাস করছেন।
তবে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক চিঠিতে তার স্বামী ও কন্যাকে যুক্তরাজ্য ত্যাগের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তিনি দেশে থাকতে পারলেও তার পরিবারের অন্য সদস্যদের অবস্থান অব্যাহত রাখার পক্ষে যথেষ্ট কারণ পাওয়া যায়নি।
ওয়ার্নাকুলাসুরিয়া জানান, অতীতে শ্রীলঙ্কায় একটি সন্তান হারানোর অভিজ্ঞতার কারণে তার বর্তমান গর্ভধারণকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আগামী ১৬ জুন তার নির্ধারিত সিজারিয়ান অপারেশনের তারিখ ঠিক করা হয়েছে। এমন একটি সংবেদনশীল সময়ে এই চিঠি পাওয়ায় তিনি মারাত্মক মানসিক চাপে রয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমি ভেবেছিলাম সন্তানের জন্মের সময়টা হবে আনন্দ ও স্বস্তির। কিন্তু এখন আমি জানি না তার স্বামী, মেয়ে কিংবা অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে। আমরা আইন মেনে চলি, নিয়মিত কর দিই এবং সমাজে অবদান রাখার চেষ্টা করি। তবুও কেন তাদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা বুঝতে পারছি না।”
তিনি আরও জানান, তাদের ছয় বছর বয়সী কন্যাকে এখনো বিষয়টি জানানো হয়নি। কারণ, শিশুটি স্কটল্যান্ডে নিজের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে এবং স্থানীয় উচ্চারণে ইংরেজি ভাষায় কথা বলে।
এদিকে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নতুন অভিবাসন নীতির অংশ হিসেবে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের কাছেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ‘গো হোম’ বা দেশে ফিরে যাওয়ার চিঠি পাঠানো হচ্ছে।
এমনকি দুই মাস বয়সী এক শিশুর নামেও সরাসরি চিঠি পাঠানোর ঘটনা সামনে এসেছে, যা তার অভিভাবকদের পরিবর্তে শিশুটির উদ্দেশেই লেখা হয়েছিল।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, আবেদনকারীদের উপস্থাপিত তথ্য পর্যালোচনা করে এমন কোনো ব্যতিক্রমী বা মানবিক কারণ পাওয়া যায়নি, যার ভিত্তিতে প্রচলিত নিয়মের বাইরে থেকে তাদের যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় এক লাখ কেয়ার কর্মীর সঙ্গে তাদের প্রায় এক লাখ ২০ হাজার পরিবারের সদস্য যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেন। এরপর থেকেই সরকার কেয়ার কর্মীদের পারিবারিক ভিসা ব্যবস্থার ওপর কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করে।
২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে কেয়ার কর্মীদের জন্য স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানদের যুক্তরাজ্যে আনার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে বিদেশ থেকে কেয়ার কর্মী নিয়োগের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
তবে মানবাধিকারকর্মী ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, যেসব পরিবার এসব বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ার আগেই বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে এসেছে, তাদের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ কতটা ন্যায়সঙ্গত।
এমনই আরেকটি ঘটনায় রাসিকা সামারাসিংহে, তার স্ত্রী চামিলা দিলরাকশি এবং তাদের তিন সন্তানের কাছেও অনুরূপ চিঠি পাঠানো হয়।
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য ভিক্টোরিয়া কলিন্স স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমালোচনা করেন এবং সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “এ ধরনের পরিশ্রমী ও সমাজে অবদান রাখা পরিবারকে নির্মমভাবে বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। স্থানীয় জনগণের মধ্যেও এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।”
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যারা যুক্তরাজ্যের জাতীয় জীবনে অবদান রাখে তাদের স্বাগত জানানো হবে। তবে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ স্বয়ংক্রিয় কোনো অধিকার নয়; এটি অর্জন করতে হয়।
সরকার আরও জানিয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যে গত চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ মাত্রার অভিবাসন ঘটেছে। এই প্রেক্ষাপটে স্থায়ী বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জনমত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রায় দুই লাখ প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে, যা বর্তমানে পর্যালোচনাধীন রয়েছে।
অভিবাসন নীতির কঠোর প্রয়োগ এবং মানবিক বিবেচনার ভারসাম্য নিয়ে যুক্তরাজ্যে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বৈধভাবে বসবাসরত পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং শিশুদের উদ্দেশে পাঠানো চিঠিগুলো সরকারের অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা যেন শিশুদের কল্যাণ ও পারিবারিক ঐক্যের মতো মৌলিক মানবিক বিষয়গুলোকে উপেক্ষা না করে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

