যুক্তরাজ্যের আর্থিক ব্যবস্থায় অর্থপাচার ও আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে সরকারের কার্যক্রম কতটা কার্যকর—তা আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণ করতে ব্যাংকার, আইনজীবী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বাস্তব ঘটনার উদাহরণ চেয়েছে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়। ২০২৭ সালে অর্থপাচারবিরোধী বৈশ্বিক সংস্থা আর্থিক কর্মকাণ্ডবিষয়ক টাস্কফোর্সের পরবর্তী মূল্যায়নের আগে এই উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
সরকারের আহ্বানে ২০২২ সাল থেকে এমন ঘটনাগুলোর তথ্য চাওয়া হয়েছে, যেখানে ব্যাংক, আইনজীবী বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্য উচ্চঝুঁকির গ্রাহককে প্রত্যাখ্যান করেছে, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করেছে অথবা তাদের পদক্ষেপের পর সরকারি তদন্ত কিংবা অপরাধের বিচার শুরু হয়েছে। গ্রাহকের তথ্য যাচাইয়ের সময় আর্থিক অপরাধের সতর্কসংকেত শনাক্ত হওয়ার পর কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসায়িক নীতিতে পরিবর্তন এনেছে কি না, সেই উদাহরণও চাওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য হলো, যুক্তরাজ্যের অর্থপাচারবিরোধী ব্যবস্থা, সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ এবং আর্থিক নিষেধাজ্ঞা কাঠামো বাস্তবে কীভাবে কাজ করছে, তার স্পষ্ট ও পরিমাপযোগ্য প্রমাণ আন্তর্জাতিক মূল্যায়নকারীদের সামনে তুলে ধরা। সরকার আগামী অক্টোবরের মধ্যে এসব তথ্য সংকলন করে আন্তর্জাতিক টাস্কফোর্সের কাছে জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরপর আগামী গ্রীষ্মে মূল্যায়নকারী দল যুক্তরাজ্যে এসে সরেজমিন পর্যালোচনা করবে।
তবে এই মূল্যায়নের আগে যুক্তরাজ্যকে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। কারণ দেশটির আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা এখনো রয়েছে। জাতীয় অপরাধ সংস্থার হিসাবে, যুক্তরাজ্যের ভেতরে বা এর মাধ্যমে প্রতি বছর আনুমানিক ১০ হাজার কোটি পাউন্ড অর্থপাচার হতে পারে। এই অর্থের সঙ্গে প্রতারণা, মানবপাচার, অবৈধ মাদক ব্যবসা এবং অন্যান্য সংঘবদ্ধ অপরাধের যোগসূত্র রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, যুক্তরাজ্যের আইনি খাতও অর্থপাচারের ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জাতীয় অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন ঝুঁকি মূল্যায়নে ২০১৭ সাল থেকে প্রতিটি মূল্যায়নেই দেশটির আইনি খাতকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। ফলে আইনজীবী, হিসাবরক্ষক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য পেশাদার সেবাদাতাদের ভূমিকা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিসও সতর্ক করেছে যে ২০২৭ সালের মূল্যায়ন যত ঘনিয়ে আসছে, যুক্তরাজ্যের অর্থপাচারবিরোধী ব্যবস্থার ওপর চাপ তত বাড়ছে। সংস্থাটির প্রশ্ন—বিপুল অর্থ ব্যয় করে তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রাখার পরও যদি প্রতি বছর আনুমানিক ১০ হাজার কোটি পাউন্ড অর্থপাচার হয়, তাহলে বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণ, গোয়েন্দা তথ্য ও আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা ঝুঁকি কমাতে পারছে।
নতুন প্রযুক্তিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতারণা বাড়ছে এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহারও বিস্তৃত হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সম্পদ ব্যবহার করে অর্থের প্রকৃত উৎস আড়াল করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাজ্যের ২০২৭ সালের মূল্যায়নকে সামনে রেখে গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী বিশ্লেষণগুলোতেও প্রতারণা, ভার্চুয়াল সম্পদ এবং নতুন আর্থিক প্রযুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে ডাকঘরকেন্দ্রিক আর্থিক সেবাকেও অর্থপাচারের সম্ভাব্য চ্যানেল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এক তদন্তে দেখা গেছে, কিছু অপরাধী ডাকঘরের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ জমা দিয়ে তা বৈধ আর্থিক লেনদেনের মতো দেখানোর চেষ্টা করেছে। এসব ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নজরদারি বাড়ালেই অর্থপাচারের ঝুঁকি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক চাপের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের অবস্থান কিছুটা জটিল। ২০১৮ সালের মূল্যায়নে দেশটির অর্থপাচারবিরোধী কাঠামোকে বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে উচ্চমানের কার্যকারিতা দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য নিজেকে অবৈধ অর্থের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক লড়াইয়ে অন্যতম প্রধান দেশ হিসেবে তুলে ধরেছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আর্থিক অপরাধের ধরন দ্রুত বদলেছে। ডিজিটাল প্রতারণা, ক্রিপ্টোকারেন্সি, জটিল করপোরেট কাঠামো এবং সীমান্তপারের লেনদেনের কারণে অপরাধীরা অর্থের উৎস ও গন্তব্য গোপন করার নতুন পথ পাচ্ছে। ফলে আগের আইন ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো কতটা কার্যকরভাবে নতুন ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারছে, সেটিই ২০২৭ সালের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
যুক্তরাজ্যের অর্থ মন্ত্রণালয় অবশ্য দাবি করছে, অর্থনৈতিক অপরাধ মোকাবিলায় সরকার কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিচ্ছে। নতুন কৌশল, আইন প্রয়োগের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত অর্থায়নের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিকে অপরাধীদের অপব্যবহার থেকে রক্ষার চেষ্টা চলছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, শিল্পখাতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের অংশ হিসেবেই আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের প্রস্তুতিতে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

